প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৪, ২০২৬, ৪:২৪ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ৪:২২ অপরাহ্ণ

ইলিয়াছ শাহেদ , গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গাইড ও গ্রামার বইকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী বাণিজ্যচক্র—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু শিক্ষক নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই কিনতে শিক্ষার্থীদের পরোক্ষভাবে বাধ্য করছেন, যার ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে এবং বাড়ছে আর্থিক চাপ।
শিক্ষার্থীদের দাবি, শ্রেণিকক্ষে ভালো ফলাফল কিংবা পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেতে হলে নির্দিষ্ট কোম্পানির গাইড ও গ্রামার বই অনুসরণ করতে হয়। অন্য বই থেকে উত্তর লিখলে নম্বর কম দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি পরীক্ষার প্রশ্ন কিংবা মডেল প্রশ্নও ওই নির্দিষ্ট গাইড থেকেই আসে বলে জানায় তারা।
উপজেলার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান—গোয়ালন্দ নাজির উদ্দিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, গোয়ালন্দ শহীদ স্মৃতি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, গোয়ালন্দ প্রপার হাইস্কুলসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের সিলেবাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ইংরেজি বিষয়ের paragraph, letter কিংবা application-এর নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু উল্লেখ না করে শুধু পৃষ্ঠাসংখ্যা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এসব পৃষ্ঠাসংখ্যা আসলে নির্দিষ্ট একটি গ্রামার বইয়ের, যা কিনতে তাদের বাধ্য হতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বই বিক্রির এ প্রক্রিয়া চলে। এতে সংশ্লিষ্টদের আর্থিক সুবিধা হয়। কেউ কেউ দাবি করেন, সেই অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হয়।
অভিভাবকদের অভিযোগ আরও তীব্র। তাদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থা এখন বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে। বাজারে অন্যান্য গাইড বইয়ে বেশি ছাড় থাকলেও নির্দিষ্ট এই বই কিনতে হচ্ছে কম ছাড়ে। এর পেছনে শিক্ষকদের সঙ্গে প্রকাশনীর আর্থিক লেনদেন রয়েছে বলেও সন্দেহ করছেন তারা।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রকাশনীর প্রতিনিধি নিয়মিত বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে পরিস্থিতি তদারকি করেন। অন্যদিকে উপজেলার সামগ্রিক শিক্ষার ফল আশানুরূপ না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীরা মৌলিক জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে গাইড নির্ভর হয়ে পড়ছে।
সরকারি গোয়ালন্দ কামরুল ইসলাম কলেজেও গাইড বই নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট গাইডই কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে গাইড ও নোটবই প্রকাশ ও বিক্রি নিষিদ্ধ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও প্রকাশ্যে এসব বই বিক্রি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও।
এ বিষয়ে গোয়ালন্দ প্রপার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “আমরা কোনো শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট গাইড বা গ্রামার বই কিনতে বাধ্য করি না। তবে সিলেবাসে পৃষ্ঠাসংখ্যা উল্লেখ থাকায় শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বই অনুসরণ করতে পারে।”
অন্যদিকে কয়েকটি সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা জানান, বিষয়টি সহকারী শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে হয়েছে।
গোয়ালন্দ কামরুল ইসলাম কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নজির হোসেন মোল্লা বলেন, “আমি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছি। আমি চাই শিক্ষার্থীরা মানসম্মত বই থেকে পড়াশোনা করুক। এ বিষয়ে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”
অভিযোগের বিষয়ে এক প্রকাশনীর বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, শিক্ষকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সাধারণত কোম্পানি বা এজেন্ট পর্যায়েই হয়ে থাকে। তিনি শুধু বই সরবরাহের দায়িত্ব পালন করেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার দাস বলেন, “বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি জ্ঞানের বদলে গাইড বাণিজ্য চলে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচেয়ে বেশি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।