প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৪, ২০২৬, ৯:২৬ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মার্চ ১৪, ২০২৬, ২:৪৫ অপরাহ্ণ
তজুমদ্দিনে ঐতিহ্যের নিদর্শন ২৫০ বছরের পুরনো হাজী মসজিদ

মেহেদী হাসান মামুন
ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাজকৃষ্ণসেন এলাকায় কালের সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় আড়াই শতাব্দী পুরনো একটি মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘হাজী মসজিদ’ নামে পরিচিত। ইতিহাস, ধর্মীয় অনুভূতি ও লোকমুখে প্রচলিত নানা অলৌকিক কাহিনিকে ঘিরে এই মসজিদটি এলাকাবাসীর কাছে এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বছর আগে আরাধন হাজী নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে মসজিদটি নির্মাণ করেন। সে সময় এলাকায় আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর তেমন প্রচলন ছিল না। বলা হয়, তিনি নিজের বাড়ির পুকুর থেকে মাটি কেটে সেই মাটি দিয়ে ইট তৈরি করেন এবং সেই ইট দিয়েই গড়ে তোলেন এই মসজিদ। নিজের ধর্মীয় অনুরাগ ও মানুষের নামাজ আদায়ের সুবিধার কথা চিন্তা করেই তিনি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বলে এলাকাবাসী জানান।
তৎকালীন সময়ে ইট দিয়ে নির্মিত হওয়ায় মসজিদটি এলাকায় দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো মসজিদটির পুরোনো কাঠামো অনেকটাই অক্ষত রয়েছে, যা সেই সময়কার নির্মাণশৈলী ও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এই মসজিদকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা অলৌকিক ঘটনার কথাও প্রচলিত রয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, গভীর রাত হলে এখানে জ্বিনেরা এসে নামাজ আদায় করে। এ কারণে অনেকেই একা এই মসজিদে নামাজ পড়তে ভয় পান। বিশেষ করে রাতের বেলায় কেউ একা মসজিদে প্রবেশ করতে সাহস করেন না বলে জানান এলাকাবাসী।
মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি মানবিক গল্প। স্থানীয় মোয়াজ্জেম গত প্রায় ১০ বছর ধরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই মসজিদে নামাজ পড়িয়ে আসছেন। ধর্মীয় অনুভূতি ও ভালোবাসা থেকেই তিনি এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে জানান।
কালের পরিক্রমায় মসজিদটি কিছুটা জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় এক সময় এটিকে ভেঙে নতুন মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় আলেম-ওলামা ও ইসলামী ফতুয়া বিশ্লেষণ করার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটি ভেঙে ফেলা হবে না। ফলে পুরনো মসজিদটি সংরক্ষণ রেখে কাছাকাছি আরেকটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হয়।
বর্তমানে প্রায় ১০০ গজের মধ্যেই দুটি মসজিদে আলাদাভাবে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা। নতুন মসজিদে অধিকাংশ মুসল্লি নামাজ পড়লেও ঐতিহাসিক এই পুরনো মসজিদেও নিয়মিত কিছু সংখ্যক প্রবীণ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। তবে ভয়ের কারণে শিশু-কিশোররা খুব একটা এখানে আসতে চায় না।
স্থানীয়দের কাছে এই মসজিদটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়; বরং এটি এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মসজিদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা গল্প, স্মৃতি ও আবেগ।
সোনাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান মিশু হাওলাদার জানান, প্রাচীন এই মসজিদটি সংরক্ষণ ও এর ইতিহাস তুলে ধরার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যথাযথ সংরক্ষণ করা হলে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এলাকার ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.