
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। ইতোমধ্যে প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনে এবার পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন ঘিরে এলাকায় শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। এই আসনে বিএনপি থেকে সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য এম. আকবর আলী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খাঁন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে মুফতি আব্দুর রহমান, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে হিলটন প্রামাণিক এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে কাস্তে প্রতীকে আব্দুল হাকিম নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
চলনবিল অধ্যুষিত এই এলাকায় ভোটের মাঠে মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বিএনপি প্রার্থী এম. আকবর আলী দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় এলাকায় তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
তিনি ১৯৭০ সালে উল্লাপাড়া সরকারি আকবর আলী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও মোমেনা আলী বিজ্ঞান স্কুল, বিজ্ঞান কলেজ, বড়হর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কুচিয়ামারা ডিগ্রি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।
দলীয় ভোটের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তার ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক রয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। অতীতে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টিও তার জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলেছে বলে জানা যায়।
নির্বাচনী প্রচারণায় এম. আকবর আলী বলেন, এটি তার জীবনের শেষ নির্বাচন। নির্বাচিত হলে উল্লাপাড়ায় চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। পাশাপাশি উল্লাপাড়াকে শিক্ষা নগরী হিসেবে আরও সমৃদ্ধ করতে একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট ও একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, নির্বাচনী এলাকার মানুষকে হয়রানিমূলক মামলার শিকার হতে হবে না।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা রফিকুল ইসলাম খাঁন সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর ২০১৮ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে তিনি এলাকায় প্রচারণা চালাতে পারেননি বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর থেকে তিনি নিয়মিত সভা-সমাবেশ করে এলাকায় সংগঠন শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বড় নেতা হিসেবে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম খাঁন বলেন, নির্বাচনী এলাকায় তার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ তাকে ভোট দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। নির্বাচিত হলে তিনি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কাজ করবেন বলে জানান। পাশাপাশি উল্লাপাড়ায় একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
তবে নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু ভোটারদের অবস্থান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উল্লাপাড়ার অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। আবার কেউ কেউ বিএনপি বা জামায়াতে যোগ দিয়েছেন বলেও জানা যায়।
উল্লাপাড়ার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা ঘুরে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার এক শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনসমর্থনের দিক থেকে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে। বিএনপিকে ভোট দিলে এলাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে এই আসনে প্রায় অর্ধলাখ সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছে। উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অতীতে বিএনপি প্রার্থী এম আকবর আলীর সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুসম্পর্ক ছিল। তাদের দাবি, নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের বিষয় বিবেচনায় অনেকেই বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও জামায়াতের সঙ্গে তাদের দূরত্ব রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভোটার সংখ্যা বেড়ে নতুন সমীকরণ নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ২১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৮০ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩২ হাজার ৫১৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১৬ জন।
সর্বশেষ হালনাগাদে নতুন করে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ৩২ হাজার ৭৭৪ জন। এর আগে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উল্লাপাড়ায় মোট ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪৩ জন। সে সময় পুরুষ ভোটার ছিল ২ লাখ ২৭ হাজার ১৪৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ছিলেন ৮ জন।
স্থানীয়দের মতে, নারী ভোটার ও নতুন ভোটারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোটের মাঠে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই উল্লাপাড়ায় বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এখন শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন দিকে ঝুঁকেন সেটিই দেখার অপেক্ষা।

আরও পড়ুন
শহীদ জিয়ার ৪৫তম শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সাকিব রাইয়্যানের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
কাউখালীতে মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার, ৪০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার
আলফাডাঙ্গায় প্রবাসীর বাড়িতে হামলা ও লুটপাট, ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল