
মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) সকালে সরজমিনে গিয়ে উপজেলার শিমুলদাইড় বাজারে জানা যায়, এবার চলতি মৌসুমে ব্যবসায়ীদের লক্ষ্যমাত্রা ৮৫ থেকে ৯০ লাখ পিস কম্বল তৈরি করবে। ফলে ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা বিক্রি আশা করছে ব্যবসায়ীরা। ইতি মধ্যে ১৫-২০ লাখ কম্বল বিক্রি করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৯৮ সালে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই শিল্প ২০২২ সাল পর্যন্ত ছিল অফলাইনে। ২০২৩ সাল থেকে অনলাইনেও বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে দেশজুড়ে এই ব্যবসা বিস্তৃত। শীতের শুরুতে গত বছরের তুলনায় এবার আরো প্রাণ ফিরে পেয়েছে কম্বলপল্লী। উপজেলার শিমুলদাইড়, শ্যামপুর, ছালাভরা, কুনকুনিয়া, বরশিভাঙ্গা, সাতকয়া, গাড়াবেড়, চকপাড়া, পাইকরতলী, ঢেকুরিয়া, বরইতলা, মুসলিমপাড়াসহ প্রায় ৪৫টি গ্রামের ৩০-৩৫ হাজার মানুষের হাতে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার কম্বল।
শিমুলদাইড় বাজারের কম্বল ব্যবসায়ী লতিফ মিয়া বলেন, এই বাজারে কম্বলের শতাধিক দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকান থেকে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অনেক জেলায় কম্বল সরবরাহ করা হচ্ছে। ক্রেতারা পছন্দ করে দরদাম ঠিক করে টাকা পাঠালে এখান থেকে ট্রাকে কম্বল পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিদিনই ট্রাকে করে কম্বল যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়।
দিনাজপুর থেকে কম্বল কিনতে আসা শহিদুল ইসলাম বলেন, শীত এলেই গরিব মানুষের কাছে এখানকার ঝুট কাপড়ের কম্বলের কদর বেড়ে যায়। দামে কম, টেকসই আর ভালো মান হওয়ায় এ কম্বলের চাহিদা বেশি। ঝুট কাপড়ের পাশাপাশি নতুন কাপড়ের কম্বলও তৈরি করা হচ্ছে। দেখতে সুন্দর ও নাগালের মধ্যে দাম থাকায় অনেকেই এখান থেকে কম্বল কিনছেন।
ছালাভরা গ্রামের আব্দুল রহিম বলেন, ২০২৩ সাল থেকে কম্বল বিক্রির জন্য অনলাইন প্লাটফর্ম খুলেছি। মৌসুমের শুরুতেই প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ টাকার কম্বল বিক্রির অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন ১৫-২০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। এ আয়ে ৩৫-৪০ জন শ্রমিকের সংসার চলছে। এবার অনলাইনের মাধ্যমেই ৩ থেকে ৪ কোটি টাকার কম্বল বিক্রির আশা করছি।
মেসার্স সহীহ ট্রেডার্সের মালিক শরিফুল ইসলাম সোহেল বলেন, বাজারে আমাদের কম্বলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দামে সস্তা, বাহারি ডিজাইন, বাজার থেকে গাড়ি লোড করার সুবিধা রয়েছে, কারো খপ্পড়ে পড়তে হয় না, সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায় এসব সুবিধার কারণে এখানকার কম্বলের চাহিদা এখন দেশ জুড়ে। তিনি আরও জানান, এখন দেশের ৪১টি জেলায় যাচ্ছে আমাদের তৈরি কম্বল। চাহিদার কথা বিবেচনা করে আমি নিজস্ব কারখানা বসিয়েছি। সেখানে সস্তায় বিভিন্ন মাপ ও রংঙের কম্বল তৈরি হচ্ছে, যার চাহিদাও রয়েছে প্রচুর।
শিমুলদাইড় কম্বল বাজার সমিতির সভাপতি গোলাম হোসেন বলেন, বর্তমানে ৩০৭ জন সদস্য রয়েছেন। প্রত্যেকেই ছোট-বড় কম্বল ব্যবসায়ী। এ মৌসুমে ৮৫ থেকে ৯০ লাখ পিস কম্বল তৈরি করে বিক্রি করা হবে। এতে ৩৫০-৪০০ কোটি টাকা বিক্রির আশা করছি।
তিনি আরো বলেন, এখন পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০ লাখ কম্বল বিক্রি হয়েছে। বাকি কম্বল ডিসেম্বর ও জানুয়ারির মধ্যে বিক্রি হবে। শীতের তীব্রতা বাড়লে কম্বল বিক্রি হতে সময় কম লাগবে।
এ বিষয়ে কাজীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সারাদেশে শিমুলদাইড় বাজারের নাম ছড়িয়ে পড়েছে কম্বল শিল্পের কারণে। কম্বল শিল্প এখন এই উপজেলার ব্র্যান্ডিং এর মতো হয়ে গেছে। ঝামেলামুক্ত পরিবেশে শ্রমিকেরা এখানে কাজ করছেন দিনরাত। এই শিল্পের প্রসারে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা পাশে আছে। কম্বল শিল্পের কারণে এখানে যারা কাজ করছে তাদের জীবনে পরিবর্তন এসেছে। আমরা কম্বল ব্যবসায়ীদের পাশে সব সময় আছি।
এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিন্ডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, কম্বল পল্লীতে ব্যাংকিং সেবার অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা কম্বলপল্লীতে এসেছিলেন, তাদের সাথে কথা বলেছি। স্বল্প সুদে যদি ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়া যায়, তাহলে এই শিল্পটি আরো উন্নত হবে।