হোম » সারাদেশ » ৮৫ বছরের এক বৃদ্ধর বেঁচে থাকার যুদ্ধ

৮৫ বছরের এক বৃদ্ধর বেঁচে থাকার যুদ্ধ

রায়হান শেখ, মোল্লারহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি 
বাগেরহাটের মোল্লাহাটে এমন একজন মানুষ আছেন, যাঁর জীবন দেখলে মনে হবে—সব হারিয়ে ও কীভাবে এখনো এতটা সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা যায়! তাঁর নাম আলাল মিয়া। বয়স ৮৫। তিন জায়গায় পা ভাঙা—লাঠি ছাড়া এক পা-ও ফেলা যায় না। প্রতিবন্ধকতা তাঁর শরীরে, দুর্ভাগ্য তাঁর সংসারে, তবুও মনোবলে তিনি পাহাড়ের চেয়েও দৃঢ়।
এই বয়সে যেখানে মানুষের দরকার শান্তি, সেবা, যত্ন—সেখানে আলাল মিয়ার জীবনে আছে শুধু হাহাকার আর একের পর এক বেদনার গল্প।
ভোর হয় আলালে মিয়ার চোখে না ঘুমে, হয় ঝুঁকি আর যন্ত্রণায় সূর্য ওঠার বহু আগেই ভোরের কাক ডাকতে না ডাকতেই লাঠি হাতে বেরিয়ে পড়েন আলাল মিয়া। কারণ তাঁকে বাঁচতেই হবে, সংসারটাকে টিকিয়েই রাখতে হবে।
তিনি ভিক্ষা করেন না। তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না। তিনি চান না কারও দান—তিনি চান নিজের ঘামে নিজের রুটি উপার্জন করতে।  তাই ৮৫ বছরের এই ভগ্নদেহ নিয়েই তিনি প্যাডেলওয়ালা ভ্যানগাড়িতে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। রাস্তাঘাট, হাটবাজার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে… যেখানে দুই টাকারও সম্ভাবনা—সেই জায়গায়ই ছুটে যান তিনি।
তাঁর ঘরেও লেগে আছে অভাবের অন্ধকার
ব্যক্তি জীবনে আলাল মিয়া ছয় সন্তানের জনক। চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, তারা আলাদা সংসার সামাল দেয়। কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার মানুষ আজ নেই।
জমিজমা বিক্রি করে সর্বস্বান্ত
একসময় সামান্য হলেও নিজের ভিটেমাটি ছিল আলাল মিয়ার। কিন্তু জীবনের নির্মম পরিহাস— সেই ভিটেমাটি বিক্রি করে দুই লাখ তিরিশ হাজার টাকা দিয়ে নতুন জায়গা কেনার জন্য বাইনা দিলে সেই টাকাও হাতছাড়া হয়। সবকিছু হারিয়ে শেষে আশ্রয় মেলে একটি সরকারি ঘরের ভেতর, যেখানে দিন আনে দিন খেয়ে কোনোমতে চলে তাঁর পরিবার।
সরকারি সহায়তা?—অভাবে তা কিছুই নয়
সমাজসেবা অফিসার জনাব ওসমান হামিদ বলেন— “তার নামে একটি বয়স্ক ভাতা কার্ড আছে—মাসে ১৬০০ টাকা। এর বাইরে কিছু করার নেই।” একজন ৮৫ বছরের মানুষ, হাঁটতে পারেন না, ঘরে স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী ছেলে—তার জন্য মাসে ১৬০০ টাকা কেমন হাস্যকর সহযোগিতা—তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব শ্যামানন্দ কুণ্ডুকে ক্যামেরার সামনে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। মানুষ মানুষের জন্য—আসুন, আলাল মিয়ার পাশে দাঁড়াই
হয়তো এই গল্প আপনার চোখে জল আনবে। হয়তো মনে হবে— একটু সাহায্য করলে একজন মানুষের জীবন বেঁচে যেতে পারে। হয়তো আপনার সাহায্যেই আলাল মিয়ার সংসারে আবার আলো ফিরতে পারে।
তিনি সাহায্যের আবেদন করেন না—কিন্তু আমাদের মানবতা কি এগিয়ে আসতে পারে না?  এই সমাজে এখনো আলাল মিয়ার মতো মানুষ আছে— যারা পরিশ্রমকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চান, যারা পরাজয় মানেন না, যারা মানবতার প্রতীকি।
আমরা যদি কেউ একটু করে হাত বাড়াই— তাহলে তাঁর সংসারে একমুঠো অন্ন, একটু ওষুধ, একটু শান্তি—সবকিছুই ফিরে আসতে পারে। হয়তো তাঁর শেষ জীবনের কিছু কষ্ট লাঘব হবে।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!