ফজলুল করিম আমতলী উপজেলার ২নং কুকুয়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের কেওয়াবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা। সাত ভাই—বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। ১৯৯৩ সালে, মাত্র ১১ বছর বয়সে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় এক ভয়াবহ বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় তিনি একটি হাত ও একটি পা হারান। শৈশবেই এমন নির্মম পরিণতি তাঁর জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। বহুদিন চিকিৎসা ও কষ্টের পর তিনি সুস্থ হন ঠিকই, কিন্তু আর কোনোদিন পূর্ণভাবে হাঁটতে বা কাজ করতে পারেননি। তবে এই সীমাবদ্ধতা তাঁর জীবনের লক্ষ্য থামিয়ে দিতে পারেনি।
ফজলুল করিম বলেন, আমি কারও বোঝা হতে চাই না। নিজের পরিশ্রমেই বাঁচতে চাই। অঙ্গ হারিয়ে জীবন শেষ হয়ে যায়নিÑএটাই আমি প্রমাণ করতে চাই। আমার ভবিষ্যৎ পর জন্ম যেন কখনো মাথা নিচু করে আমার জন্য হাঁটতে না হয়। তাঁর এই অদম্য মানসিকতাই তাঁকে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সাহস জুগিয়েছে। ২০০৫ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বর্তমানে দুই কন্যা সন্তানের জনক ফজলুল করিম নিজের পরিবার, সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন প্রতিনিয়ত।
নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য ফজলুল করিম সিদ্ধান্ত নেন স্বনির্ভর হওয়ার। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি বাড়ির কাছেইÑপূর্ব কেওয়া বুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেÑএকটি ছোট দোকান গড়ে তোলেন। দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন স্কুল শিক্ষার্থীদের নানারকম খাবার বিক্রি করেন তিনি। প্রতিদিন সকালে দোকান খোলেন, স্থানীয় শিক্ষার্থী, স্কুলের শিক্ষক, কৃষক ও পথচারীরা তার ক্রেতা। নিজের পরিশ্রমে অর্জিত প্রতিটি টাকাই তাঁর কাছে আত্মসম্মান ও গর্বের প্রতীক।
তবে সম্প্রতি তাঁর জীবনে নেমে এসেছে নতুন দুঃখের অধ্যায়। একবার নয়, দুইবার তাঁর দোকানে চুরি হয়েছে। চোরেরা দোকানের প্রায় সব মালামাল নিয়ে যায়। এতে তাঁর ক্ষতি হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মতো। চুরির পর থেকে দোকানে বেশি মাল তুলতে পারছি না। দোকানের টিনও ভেঙে গেছে, কিন্তু টাকার অভাবে সেটি ঠিক করতে পারিনি। খুব কষ্টে এখন দিন চলছে। বর্তমানে তাঁর দোকানে মাত্র অল্প কিছু পণ্য রয়েছে। আর্থিক সঙ্কটে তিনি দোকানটি নতুন করে সাজাতে পারছেন না।
আমতলী সাংবাদিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এইচ এম কাওসার মাতবর বলেন, ফজলুল করিমের জীবন আমাদের শেখায়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো সীমাবদ্ধতা নয়। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, আত্মনির্ভরতা ও পরিশ্রমই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
স্থানীয় সমাজসেবী, শিক্ষক ও প্রতিবেশীরাও তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাঁরা মনে করেন, ফজলুল করিমের মতো মানুষ সমাজে অনুপ্রেরণার বাতিঘর। তাঁর মতো প্রতিবন্ধীদের পাশে সমাজকে আরও বেশি এগিয়ে আসা উচিত। পূর্ব কেওয়া বুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক বলেন,ফজলুল করিমের জীবনকাহিনী শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়Ñএটি পুরো সমাজের জন্য এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন, হাত—পা হারানো মানে জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং এটি হতে পারে নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর প্রেরণা।
১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য , জহির মাতুব্বর বলেন, হাত—পা না থাকলে যে অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে হবে সেটা কিন্তু আমরা ফজলুম করিমের ভিতর দেখি নাই। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি তাকে সহযোগিতা করার। আমতলী সমাজসেবা অফিসার মঞ্জুরুল ইসলাম কাওসার বলেন, আমরা আমাদের নিয়ম অনুযায়ী ফজলুল করিমকে সহযোগিতা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। তাঁর কাজকে আমরা সাধুবাদ জানাই। হাত—পা না থাকলে যে অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে সেটা কিন্তু তার মাথায় নাই। সে নিজে কিছু করে দেখাতে চাই সমাজকে।
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান খান বলেন, সমাজের অনেক মানুষ আছেন যে এই অবস্থায় থেকে ভিন্ন পন্থায় জীবন পরিচালনা করেন কিন্তু তার একটি হাত এবং পা নেই সে নিজের কিছু করতেছে এটা অবশ্যই ভালো। তিনি আবেদন দিলে আবেদনের সত্যতা যাচাই করে সরকারি কিংবা বেসরকারি ভাবে তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।