প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৫, ২০২৬, ১:৪১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ৭, ২০২৫, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ
মোল্লাহাট উপজেলা হাসপাতাল অব্যবস্থাপনা ও সংকটে ধুঁকছে

রায়হান শেখ, মোল্লাহাট (বাগেরহাট)প্রতিনিধি:
জনবল সংকট, চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অল্প কিছুদিন আগেও স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের শীর্ষ ৫০টি হাসপাতালের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান এখন ১৮২ নম্বরে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সরকারি এই হাসপাতালটির সুনাম পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু পরিচ্ছন্নতার জন্য মঞ্জুরীকৃত ৫টি আয়া ও সুইপারের পদে মাত্র একজন কর্মরত। ফলে হাসপাতালের ভেতরে ও টয়লেটের দুর্গন্ধে রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। রোগীদের অভিযোগ, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট থেকে ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস বি, জন্ডিসসহ পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর শঙ্কা বাড়ছে।
হাসপাতালের মোট মঞ্জুরীকৃত পদের প্রায় ৬৮.০৯% পদ শূন্য। ২৮ জন প্রথম শ্রেণির চিকিৎসকের মধ্যে কর্মরত আছেন একজন ডেন্টাল ডাক্তার সহ মোট ৮ জন। ১৯ টি চতুর্থ শ্রেণির মধ্যে ৭ জন এবং তৃতীয় শ্রেণির ৭১জন। দ্বিতীয় শ্রেণির ৩৫ জন। স্বাস্থ্য সহকারী ৩৮ জনের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৩ জন। সার্বিকভাবে জনবল সংকটে স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতালে জুনিয়র সার্জারি কনসালটেন্ট থাকার কথা ১১ জন। কাগজে কলমে একজন থাকলেও বাস্তবে কেউ নেই। জুনিয়র সার্জারি কনসালটেন্ট ডাঃ রওশানারা কাগজে-কলমে থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় কর্মরত। ডাঃ নাহিদুল ইসলাম এবং ডাঃ আলবার্ট মানিক সরকার দির্ঘদিন যাবত অনুপস্থিত।
ওটির সকল যন্ত্রাংশ থাকলেও ডাক্তার না থাকার ফলে সিজার সহ অনেক ধরনের অপারেশন বন্ধ রয়েছে। মহিলা গাইনি ডাক্তার না থাকায় প্রসূতি রোগীরাও মারাত্মক বিপাকে পড়ছেন। দরিদ্র রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ করছেন। অথচ সরকারী হাসপাতালে মাত্র ১০ টাকায় সিজারিয়ান সুবিধা পাওয়া জনগনের নাগরিক অধিকার। সরকারী হাসপাতালে এই সুবিধা না থাকায় এই সুযোগে দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে ল্যাব টেকনিশিয়ান না থাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ল্যাবের যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। এক্সরে মেশিন, ইসিজি মেশিন নষ্ট পড়ে আছে। আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও নেই অপারেটর/ডাক্তার।
এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালালদের অবাধ দৌরাত্ম্য ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিয়ে টেস্টের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ল্যাব টেকনিশিয়ান সরকার নির্ধারিত মুল্যের থেকেও অধিক আদায় করছেন এবং কাউকেই তিনি রসিদ প্রদান করেন না। কমিশনের লোভে রোগীদের নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক থেকে টেস্ট করাচ্ছেন। অফিস চলাকালীন সময়ে তার সরকারি ল্যাবের সামনে দুজন বহিরাগত দাঁড়িয়ে থেকে টেষ্ট বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
হাসপাতালের এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন নষ্ট, আধুনিক ল্যাব মেশিন নেই। ফলে রোগীরা বিভ্রান্ত ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের সন্তোষজনক তালিকায় থাকা হাসপাতালটির এই অবনতি জনমনে গভীর হতাশা তৈরি করেছে।
মোল্লাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃপঃ কর্মকর্তা ডাঃ তেন মং বলেন, জনবল সংকটে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে অসুবিধা হচ্ছে। বিশেষকরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ বা আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। সীমিত জনবল দিয়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এছাড়া কোন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সচেতন মহল বলছেন, মোল্লাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে কেন্দ্র করে একটি দালাল চক্র সক্রিয়। এখানে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ ও অব্যবস্থাপনা রোধ না করলে এ হাসপাতালের মান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না।
সেবাপ্রার্থীরা বলছেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখতে দ্রুত সুইপার নিয়োগ করতে হবে। অপারেশন থিয়েটার চালু ও গাইনি-জুনিয়র সর্জারি কনসালটেন্ট ডাক্তার নিশ্চিত করতে হবে। দালাল ও কমিশন বাণিজ্য বন্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। নষ্ট এক্স-রে ও ইসিজি মেশিন দ্রুত মেরামত করার ব্যবস্থা ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের দাবি জানান তারা।
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.