
গত ২৪ আগষ্ট সিরাজগঞ্জে দুদকের ১৮১তম গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গণশুনানিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী। গণশুনানিতে অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো দুদকের তফসিলভুক্ত করেন। পরে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছেন।
মাউশি ও কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন প্রফেসর আমিনুল ইসলাম। এর পরই বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মানী বণ্টনে অনিয়ম শুরু করেন। শুধু গত এক বছরে অন্তত চারটি পাবলিক পরীক্ষা উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স পার্ট-১, অনার্স পার্ট-২ এবং ডিগ্রি এবং তিনটি অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা উচ্চ মাধ্যমিক হাফ-ইয়ারলি, অনার্স পার্ট-২ ও মাস্টার্সসহ তিনটি ব্যবহারিক পরীক্ষার অর্থ বণ্টনে মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা উপেক্ষা করে ২০ লাখ টাকার অতিরিক্ত আদায় করেছেন।
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য কোনো বাস না থাকলেও তিনি শিক্ষার্থী প্রতি বছরে ২৫০ টাকা করে আদায় করছেন। এতে বছরে প্রায় ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। পরিবহনের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ অধ্যক্ষের ব্যবহারের জন্য হায়েস গাড়ির পেছনে ব্যয় করা হয় বলে জানা গেছে। নিজের ব্যক্তিগত কাজে এ গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি। গাড়ি মেরামত এবং তেল খরচ বাবদ বছরে ৬২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। পরবর্তীতে ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে এ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদিও একটি হায়েস গাড়ির পেছনে এক বছরে এতটাকা ব্যয় হওয়া সম্ভব না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময় আইসিটি খাতে ৫০ টাকা করে নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে অধ্যক্ষ এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তিনি ১০০ টাকা করে আদায় করেন। কলেজে ২৫ হাজারের অধিক শিক্ষার্থীর নিকট আদায় করা অতিরিক্ত অর্থের পরিমান ১৫ লাখ টাকার বেশি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় প্রতি বছর একবার বিবিধ খাতে ১০০ টাকা নেওয়ার নিয়ম থাকলেও ভর্তির সময় এবং ফরম পূরণের সময় পৃথকভাবে এ অর্থ আদায় করেন তিনি। প্রতি বছর ভর্তি ও ফরম পূরণের সময় শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ১০০ টাকা করে তোলা হচ্ছে। এ খাত থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা বাড়তি আদায় করেছে তিনি।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের এক শিক্ষক বলেন, অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলামের অনিয়মের শেষ নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ২৫০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ টাকা পরীক্ষার জন্য এবং ১৫০ টাকা কেন্দ্রের জন্য। দুটি মিলিয়ে সাড়ে ১৩ লাখ টাকার বেশি পায় কলেজ। এ অর্থ থেকে কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা শিক্ষক এবং কমিটির ১৪ জনকে দুই লাখ ৭০ হাজার এবং আরও আড়াই লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট টাকা অধ্যক্ষ নিজেই নিয়েছেন। যদিও এভাবে টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই। এ টাকাগুলো ভুয়া বিল-ভাউচার করে সমন্বয় করা হয়।’ এক্ষেত্রে কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি।’
এ বিষয়ে প্রফেসর আমিনুল ইসলাম বলেন, কিছু শিক্ষক এবং কয়েকজন বখাটে শিক্ষার্থী আমার সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্য দুদক এবং মাউশিতে অভিযোগ দিয়েছে। কলেজের একটি হায়েস গাড়ি রয়েছে। এ গাড়ি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়া-আসার কাজে ব্যবহার করা হয়। গাড়ির মেইনটেন্স খরচ রয়েছে। ফলে অর্থ খরচ হবেই।
তিনি আরো বলেন, চা-নাস্তার জন্য পাঁচ হাজার টাকা খরচ করা হয়েছে। কয়েক লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। খাবার-দাবারের জন্য কিছু টাকা খরচ করা হয়েছিল। তবেও সেটিও খুব বেশি না। মাউশির ডিজির জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তার আগমন উপলক্ষে দেড় লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করায় আমার সম্মানহানী হয়েছে। একটি হায়েস গাড়ির জন্য বছরে এতটাকা কীভাবে ব্যয় হয়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কলেজে গিয়ে দেখা করে তথ্য নেওয়ার কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) এ ব্যাপারে মাউশির তদন্ত দলের প্রধান সংস্থাটির কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক প্রফেসর বি. এম. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ। বিষয়গুলো তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তাধীন কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। তবে আমরা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করছি। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।