প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৪, ২০২৬, ৭:২১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মার্চ ৬, ২০২৫, ১২:১৮ অপরাহ্ণ
মধুপুরের অগ্রীম আনারস পাঁকাতে মাত্রারিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ।

শুরু হয়েছে রমজান মাস, ইফতারির অনুষঙ্গতে ব্যবহার হয় নানা জাতের ফল মূল। তেমনি একটি অনুসঙ্গ হচ্ছে মধুপুরের সুস্বাদু আনারস। যা খেলে মুখের স্বাদ ও রুচির পরিবর্তন হয়। এই ফলের বাজারে চাহিদা থাকা ও অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় অসাধু কিছু ব্যবসায়িরা টাঙ্গাইলের মধুপুরের আনারস বাগানগুলোতে দেদারসে প্রয়োগ করছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নানা জাতের ওষুধ।
রমজানে রসনা বিলাসে আনারস যুক্ত করার জন্য কৃষক ও আনারস ব্যবসায়িরা আনারস বাগানে পরিচর্যা করছেন নিয়মিত। মধুপুরের পাহাড়ী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্রই। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানাগেছে, চলতি মৌসুমে মধুপুরে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আনারসের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ক্যালেন্ডার, জলডুগি ও এমডি-টু জাতের আনারস রয়েছে। চলমান সময়ে জলডুগি আনারস বাজারে আনার জন্য ও অধিক লাভের জন্য কৃষকরা মেতে উঠেছেন নানা রকম ওষুধ প্রয়োগ করে পাকানোর । চলতি মৌসুমে ২ হাজার ৭৯২ হেক্টর জমিতে জলডুগি জাতের আবাদ হয়েছে এই আনারসের রাজধানীতে।
বাংলাদেশে আনারসের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মধুপুর বনাঞ্চলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা আনারস চাষ শুরু করেন। পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে এ অঞ্চলে তাঁদের সম্প্রদায়ে লোকজন আনারস চাষ শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যে এ আনারসের সুনাম সারা দেশেসহ বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমানে সেই সুনাম বিলিন হওয়ার পথে। কেননা অসাধু ব্যবসায়িরা অধিক লাভের আশায় অসময়ে পাকানোর ফলে আনারসের আসল স্বাদ ও গন্ধ হাড়িয়ে যাচ্ছে। যার ফলে ক্রেতা হাড়াতে বসেছে মধুপুরের এই সম্পদটি।
আনারস ব্যবসায়ী হাফিজুল ইসলাম জানান গত বছর, ২ লাখ আনারস কিনেছিলাম বেশ ভালো লাভ হয়েছিল। এ বছর ৪-৫ লাখ আনারস কিনেছি। ৬০-৬৫ লাখের মত টাকার মতো ইনভেস্ট হয়েছে । দেশের যে অবস্থা এবার অনেক টাকা লস হবে বলে মনে হচ্ছে । সামনে রমজান রেখে অনেকই পাকানোর মেডিসিন প্রয়োগের ফলে বাজারে আরও ধস নেমেছে।
উপজেলার আশ্রা,শালিকা, মহিষমারা, গারোবাজার, ইদিলপুর, মোটের বাজার, কাইলাকুড়ি, হাগুড়াকুড়ি, শোলাকুড়ি, ঘুঘুর বাজার, গায়রা গ্রামের বিভিন্ন বাগানগুলো ঘুরে দেখা গেছে শ্রমিকরা আনারসে রাসায়নিক স্প্রে করাতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
শালিকা গ্রামের ইসমাইল হোসেন বলেন, আনারসের চারা মোটামুটি বড় হইলে গাছের মাথায় গর্ভবতী হওয়ার মেডিসিন দিলে কয়দিন পরেই সবগাছে গুটি ধরে। যেগাছে গুটি ধরেনা সেই গাছে আবার গর্ভবতী দিলেই গুটি বাইর হয়। তার বাদে ১৫/১৬দিন পরপর দুই বার তিনবার হরমোন দেই। আনারস বড় হয়। পাকানির ওষুধ দিলে ঝাত কইরা একবারে পাকে। এক মুহি থিকা কাটি আর বেচি।
রানিয়াদ গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুল বারেক জানান, জমি বর্গা নিয়ে আনারস চাষ করি। ক্রেতারা বড় এবং ভালো রঙের আনারস বেশি কেনেন। তাই বাধ্য হয়ে রাসায়নিক ব্যবহার করেন। এতে মুনাফা বেশি হয়। বিভিন্ন সার ও কীটনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসব রাসায়নিক সরবরাহ করছে। এসব রাসায়নিকের বোতলের গায়ে পাকানোর জন্য ব্যবহারের নিয়ম লেখা থাকে না। কিন্তু কৃষকেরা পাকানোর জন্য সব সময় এগুলো ব্যবহার করেন। একাধিক কৃষক জানান, দ্রুত ফল ধরা এবং ফল বড় হওয়ার জন্য ১০ লিটার পানিতে ২ থেকে ৩ মিলিলিটার রাসায়নিক ব্যবহারের কথা বলা হয়। তবে কোনো কোনো কৃষক ১০ লিটার পানিতে ২ থেকে ৩ মিলিলিটারের স্থলে ২০০ থেকে ৩০০ মিলিলিটার পর্যন্ত রাসায়নিক মিশিয়ে আনারসে স্প্রে করেন। এতে আনারস দ্রুত পেকে যায় ও রং সুন্দর হয় এবং একসঙ্গে পুরো জমির আনারস বাজারে তোলা যায়। যার ফলে কৃষকরা একসাথে বিক্রি ও টাকা হাতে পায়।
গারোবাজারের সাংবাদিক ও শিক্ষক সাজ্জাদ রহমান জানান, এক সময় মধুপুরের আনারস মিষ্টি ও সুস্বাদু ছিলো। যার কারনে দেশজোড়া সুনাম ছিল। বর্তমানে শিয়াল, কটা বানর(কাঠ বিড়ালি), টগা(বুলবুলি), বানর, এরাও এখন আনারস খায় না। বিভিন্ন মেডিসিন দেয়ার ফলে বাগানের আশেপাশে মানুষও আসেনা। অনেকে খাইতেও চায় না। আমাদের অসাধুতার কারণে আজকে আনারসের এই দুরবস্থা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিব আল রানা জানান, মধুপুরের আনারস খুবই সুস্বাদু। বর্তমানে ক্যালেন্ডার, জলডুগি ও এমডি-টু জাতের আনারস আবাদ হচ্ছে। অনেকে আনারস পাকানোর ওষুধ ব্যবহার করে ক্ষতির মুখে পরছেন। আমরা কৃষকদেরকে সচেতন করতে রাত-দিন চেষ্টা করছি । যাতে করে তারা রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ম ও মাত্রা মেনে ব্যবহার করে। এই রাসায়নিক না ব্যবহার করলেও ক্ষতি নেই। নিয়ম মানলে কৃষকের লাভও হবে। ভোক্তারাও সুস্বাদু আনারস খেতে পারবেন। আমরা বিভিন্ন ওষুধের দোকান মনিটরিং করছি। যাতে করে অবৈধভাবে আনা কোন ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য দোকানে বিক্রি করতে না পারে। এজন্য আমরা ব্যবসায়িদেরকেও তদারকি করছি।
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.