
আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাসহ একটি সিন্ডিকেটের হাতে ১৬ বছর ধরে জিম্মি ছিলো কক্সবাজারের মানুষ। এসব চিহ্নিত ক্ষমতাধরদের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের নামে চলেছে ব্যাপক লুটপাট। মেগা প্রকল্পে লুটপাট ছাড়াও গেল দেড় যুগ ধরে হোটেল দখল, ট্রেন্ডারবাজি, মদেরবার দখল, জবর-দখল, অস্ত্রবাজি ও ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
সরকারি বনাঞ্চল নিধন করে চিংড়ি ঘের নির্মাণ, সরকারি মৎস্য অবতরন কেন্দ্রকে আয়না ঘরের মত টর্চার সেল বানানো, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনকে পোষা বাহিনীর মত ব্যবহার করা, ভোট ডাকাতি, অস্ত্র দিয়ে মানুষ খুন, নিরীহ মানুষের বাড়িঘর ও দোকানপাট দখল, বাড়িঘর নিরংকুশ ভোগ দখলে বাঁধা সৃষ্টি, সাধারণ জনগন আইনানুগ ব্যবস্থা করতে না পারা, বিচারিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়েছে।
গেল ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকার পরিবর্তনের পর এসব অপকর্মে জড়িতরা গা ঢাকা দিয়েছে। ঐসময়ে তুমুল আলোচনায় ছিল আশেক-মকছুদ সিন্ডিকেট। সাবেক এমপি আশেক- মেয়র মকছুদ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারী মেগা প্রকল্পে হরিলুটের অভিযোগ রয়েছে।
মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে লুটপাটের কারণে বিপুল রাজস্ব খোয়া গেছে। এছাড়াও কমিশন বাণিজ্য করে পকেট ভারি করেছিলো আশেক মকসুদের সিন্ডিকেটের চিহ্নিত কয়েকজন। এভাবে তারা হাজার কোটির টাকার মালিক বনে গেছেন।
ভূক্তভোগিরা জানান, গেল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনের জন্য ১ আগষ্ট থেকে ৪ আগষ্ট পর্যন্ত সাবেক এমপি আশেক উল্লাহ এবং মহেশখালীর সাবেক পৌর মেয়র মকসুদ মিয়ার নেতৃত্বে আরাকান বিদ্রোহীদের নিকট থেকে ভয়ংকর অস্ত্র কিনে ট্রলার ভর্তি করে মহেশখালী চ্যানেলে নিয়ে আসে। সেখান থেকে পুরো জেলায় ছাত্র জনতার আন্দোলনে অস্ত্রগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। ওই সময় দুইজনের প্রাণহানিসহ বহু ছাত্র-জনতা আহত ও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। জেলা পুলিশের সিনিয়র কয়েকজন কর্মকর্তার সামনেই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিধ্বংসী অস্ত্রের প্রকাশ্যে ব্যবহার হলেও ওইসব অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।
জেলা পুলিশের সিনিয়র অফিসারদের অনেকেই এখনও কক্সবাজারে কর্মরত আছেন। প্রকাশ্যে ছাত্র জনতার আন্দোলনে বেপরোয়া গুলি চালিয়েছিল আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকমীরা।
অস্ত্রগুলোর মধ্যে বিদেশী রিভলভার (বেলজিয়ামের তৈরী), অত্যাধুনিক স্নাইপার রাইফেল, শটগানসহ মারাত্মক মারানাস্ত্র। আর মারাত্মক মারানাস্ত্র আনতে অর্থয়ান করেন আশেক উল্লাহ’র দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক পার্টনার আইয়ুব খান ও গিয়াসউদ্দিনসহ একাধিক ব্যক্তি। বিষয়টি এখনও টক অব দ্যা কক্সবাজার হিসেবে রয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আশেক উল্লাহ’র পার্টনার আইয়ুব খান বলেন, ২০০১ সাল থেকে তিনি বৈধভাবে আশেক উল্লাহ’র সাথে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করেছেন। এর বাহিরে তার সাথে আরও কোনো সম্পর্ক নেই।
কুতুবদিয়া নাগরিক ঐক্য পরিষদের সচিব জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, বিগত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী দুঃশাসনের দোসর আশেক উল্লাহ রফিকের অর্থ যোগানদাতা ছিলেন ঠিকাদার আয়ুব। আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি কর্মসূচিতে তার অর্থ ছিল। আয়ুবের বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি দাবি জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি বিচক্ষণ যৌথ বাহিনী ও থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে দ্বীপ উপজেলা মহেশেখালী ও কুতুবদিয়া হতে বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে রয়েছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
এদিকে একাধিক সূত্র বলছে, ইতোমধ্যে তারা অনেকেই ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের পর কৌশলে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় চলে গেছেন। সর্বশেষ তারা দুবাই’তে অবস্থান করছেন বলেও খবর বেরিয়েছে। আবার অনেকে বলেছেন মহেশখালী সাবেক পৌর মেয়র মকসুদ স্থানীয় বিএনপির আশ্রয়ে নিজ বাড়িতে আছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সমন্বয়ক জানান, গেল ৪ আগষ্ট বিকাল ৫টায় আশেক উল্লাহ ও মকসুদের নেতৃত্বে শট গান, রাইফেল নিয়ে মহেশখালী থেকে শতাধিক সন্ত্রাসীসহ কক্সবাজার শহরের ছাত্র আন্দোলন দমাতে গিয়ে শহীদ স্মরনী সড়কস্থ জেলা বিএনপি অফিস জ্বালিয়ে দেয় এবং তাদের শটগানের গুলিতে একজন শিক্ষার্থী নির্মমভাবে নিহত হন। ওই সময় শতাধিক ছাত্র-জনতা গুলিবিদ্ধি হয়।
এনিয়ে কক্সবাজার জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী জানান, ৪ আগষ্ট কক্সবাজারে যে ভয়ংকর অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা উদ্ধার করা খুবই জরুরী। ওইদিন খুনিরা হঠাৎ করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। পাশাপাশি জেলা বিএনপির অফিসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। যারা এ নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিলো তাদের গ্রেফতারের জন্য জেলা বিএনপি জোর দাবী জানিয়েছেন।
২০১৪ সাল থেকে আশেক উল্লাহ ও মকসুদের নেতৃত্বে দ্বীপ উপজেলার প্রায় ৫ লক্ষ জনগণকে জিম্মি করে। মহেশখালী দ্বীপের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ফেরীঘাট কক্সবাজার জেলা প্রশাসন এবং আশেক, মকসুদ অবৈধভাবে খাস কালেকশনের নামে মহেশখালীর সাধারণ জনগনকে জুলুম অবিচারের মধ্যে রেখেছিলেন। তাদের ব্যাপারে সচেতন নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম কথা বললে শারিরীকভাবে নির্যাতনসহ মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হতো। যার কারনে কেউ ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি।
আশেক উল্লাহ ও মকসুদ ফেরীঘাট নিয়ন্ত্রণে রাখার আরেকটি কারন হলো, মায়ানমার থেকে মকসুদের ফিশিং ট্রলারযোগে ইয়াবা কারবার ও চোরাচালান ছিলো। এ ব্যাপারে সাধারণ নাগরিকরা ১৬ বছর ধরে মুখ খুলতে পারেন না।
হাসিনা সরকারের অবৈধ এমপি আশেক উল্লাহর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করতো মকসুদ মিয়া। তার নেতৃত্বে রয়েছে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী। ইয়াবা চোরাচালানের মাধ্যমে মকসুদ, আশেক এখন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। তার ক্যাশিয়ার ও পার্টনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের সেই দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার শাহাদাত হোসেনসহ আরও কয়েকজন ক্যাশিয়ার। বর্তমানে তাদের রয়েছে সম্পদের পাহাড়। তার মধ্যে মহেশখালীতে আলিশান বাড়ি, কক্সবাজারে ফ্ল্যাট, ঢাকায় ফ্ল্যাট বাড়িসহ বিদেশে টাকা পাচার উল্লেখ্যযোগ্য। যা আলাদীনের চেরাগের গল্পের মতো। তারাও কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাহিরে রয়েছে। তাদের সাথে ওই সিন্ডিকেটের যোগাযোগ রয়েছে বলে একাধিক সূত্র দাবী করেছেন।
এ বিষয়ে আরও জানার জন্য আশেক উল্লাহ’র মাতারবাড়ি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রধান পার্টনার শাহাদাত হোসেনের সেল ফোনে (হোয়াটসঅ্যাপ) যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশের বাহিরে বলে জানান এবং এ বিষয়ে কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
স্থানীয়রা জানান, গেল ৪ বছর আগে মকসুদের বড় ছেলে ঢাকায় বড় একটি ইয়াবা চালানসহ আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। পরবর্তীতে বিচার প্রক্রিয়ায় মকসুদের ছেলের বিরুদ্ধে ১৪ বছরের সাজা হয়। বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী মকসুদের ছেলে পরিবর্তে মোটা টাকার বিনিময়ে মহেশখালীর একজন নিরীহ ছেলেকে কারাগারে সাজা ভোগ করার জন্য পাঠিয়েছেন। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান আছে। গেল ৫ আগষ্ট খুনি হাসিনার পতনের পর আশেক ও মকসুদ গা ঢাকা দিলেও তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন সিন্ডিকেটের অপর সদস্যরা। তবে ঘটনার বিষয়ে মহেশখালী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মকসুদ মিয়ার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আমজাদ হোসেন জানান, এই সিন্ডিকেটের হাতে তিনি ১৬ বছর ধরে নানা ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানান। তিনি ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দায়ের করেছেন বলে জানান।
এদিকে, দ্রুত আশেক উল্লাহ ও মকসুদ মিয়াকে গ্রেফতার পূর্বক অস্ত্রের ভান্ডার জব্দ করার জন্য অন্তর্বতীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নিকট একাধিক ভূক্তভোগি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
-মোহাম্মদ খোরশেদ হেলালী-