
প্রতারণার মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি রাজশাহী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এসএম এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ক্ষমতাচ্যুত আ’লীগ সরকারের কিছু মন্ত্রী,এমপি ও দলটির কতিপয় নেতার অত্যন্ত ঘণিষ্ঠ হিসেবে বহুল পরিচিত এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকলেও বহাল তদবিরে রয়েছেন তিনি। অধ্যক্ষ এমদাদুল হক নিয়মিত অফিস করছেন। পাশাপাশি তিনি অন্যান্য দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও নিয়মিত পরিচালনা করছেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পুলিশ তাকে ধরছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে জোরপূর্বক একাধিক কোর্সে ভর্তি করিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটির চলতি বছরের কোরিয়ান ভাষা ব্যাচের (মে-আগষ্ট) শিক্ষার্থীরা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো ওই অভিযোগে শিক্ষার্থীরা বলেন, বিদেশ গমনেচ্ছুক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা শুধু কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা কোর্সে ভর্তি হতে চান তাদেরকে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। বলা হয়,কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা কোর্সে ভর্তি হতে হলে কার্পেন্ট্রি কোর্স করা বাধ্যতামূলক। তবে নিয়মানুযায়ী এটা বাধ্যতামূলক না হলেও অতিরিক্ত টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের এই কোর্স ভর্তি হতে বাধ্য করা হয়। এক হাজার টাকা দিয়ে কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা কোর্সে ভর্তি হওয়া যায়। অথচ তাদেরকে অতিরিক্ত আরো ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে কার্পেণ্ট্রি কোর্স করতে হয়। সব মিলিয়ে তাদের কাছ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা অন্যায়ভাবে আদায় করা হয়।
এতে আরো জানানো হয়,রাজশাহী টিটিসিতে প্রতি ব্যাচে ৫০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এরমধ্যে লটারির মাধ্যমে ৩০ জন এবং বাকি ২০ জন প্রার্থী অধ্যক্ষের রেফারেন্সের (সুপারিশ) মাধ্যমে ভর্তি হয়। ফলে গরিব শিক্ষার্থীরা এখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হন। একটি ব্যাচেই ৫০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এই টাকার কোনো হিসাব নেই। ১৯ থেকে ২৩ তম ব্যাচ পযর্ন্ত অধ্যক্ষ এভাবে দুর্নীতি করে আসছেন বলেও অভিযোগ উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়,কার্পেন্ট্রি ক্লাস করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা দেখতে পান,প্রশিক্ষণের জন্য ভালো কাঠের ব্যবস্থা করা হয়নি। আগের ব্যবহার করা ছোট কাঠের টুকরো দিয়ে পরবর্তী ব্যাচের শিক্ষার্থীরা কাজ করেন। এছাড়া কাঠের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিগুলো অনেক পুরানো। আবার যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তার কিছু ক্ষেত্রে কোরিয়ার বাস্তব কাজের সাথে কোনো মিল নেই। এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা জানতে চাইলে তাদেরকে বলা হয়,এই কার্পেন্ট্রি কোর্স হলো লেভেল-১ এর ব্যাসিক কাজ শিখে আরপিএল এর মাধ্যমে অ্যাসেসমেন্ট পরীক্ষা। তখন শিক্ষার্থীরা জানতে চান লেভেল-১ অ্যাসেসমেণ্টের রেজিস্ট্রেশন ফি মাত্র ৫৫০ টাকা,তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা কেনো নেওয়া হল। শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে এ ঘটনার সাথে জড়িত সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান।
এছাড়া অটোমেকানিক্স ট্রেডে এসইআইপি প্রজেক্ট এবং দেশ-বিদেশে ড্রাইভিং প্রজেক্টের অধীনে ফ্রি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কোর্সেও ড্রাইভিংয়ের লেভেল-১ বা লেভেল সার্টিফিকেট দেওয়ার নামে ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হয়। কেউ যদি বলেন,আমি লেভেল করবো না শুধু ফ্রি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ করব। তখন তাকে ভাইবা পরীক্ষাতেই বাদ দেওয়া হয়। অর্থাৎ টাকা দিতে না পারায় তাকে ড্রাইভিং কোর্সে সুযোগ দেয়া হয় না। এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স বের করার নামে প্রতিটি প্রার্থীর কাছ থেকে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার মতো উৎকোচ নেয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এভাবে অধ্যক্ষের যোগসাজসে বিভিন্ন কোর্সে অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয় বলেও জানান তারা। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এসএম এমদাদুল হক বলেন,কোনো মামলায় আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেনি আদালত। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি সঠিক নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,যাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে তারা চাইলে টাকা ফেরত নিতে পারবে।
গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি : মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রাজশাহী সিআইডির ইন্সপেক্টর আনিসুর রহমান বলেন, মামলার এজাহারে প্রথমে আসামি ছিলেন দুইজন। পরে ঘটনাটি তদন্তকালে টিটিসির অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এসএম এমদাদুল হক ও ইনস্ট্রাকটর আইউব উল আজাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। তদন্তে উঠে আসা প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এসএম এমদাদুল হকসহ মোট চারজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় গত বছরের (২০২৩) ৩১ ডিসেম্বর। মামলাটির বাদী হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার বাসুদেবপুর গ্রামের মজিবুর রহমানের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান।
তদন্ত কর্মকর্তা আরো জানান,বর্তমানে মামলাটির চার আসামির মধ্যে আদালত কর্তৃক টিটিসির অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এসএম এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। আর বাকি অপর তিন আসামি জামিনে রয়েছেন। মামলাটির আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা জানান,প্রতারণার একটি মামলায় অধ্যক্ষ এমদাদুল হকসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করা হয়েছে। তবে চার আসামির মধ্যে অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এসএম এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি জারি রয়েছে। অপর তিন আসামি জামিনে রয়েছেন।
কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পুলিশ অধ্যক্ষ এমদাদুল হককে গ্রেফতার করছে না বলে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। পুঠিয়া থানার ওসি কবির হোসেন বলেন,পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করছে না এমন অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি বলেন,দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করা হবে।
– আবুল হাশেম-

আরও পড়ুন
বগুড়া মহাস্থান মাজারের ১৫ দানবাক্সে মিলল সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা, গণনায় লেগেছে প্রায় দুই দিন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার
নওগাঁয় সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করায় যুবক আটক