প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৪, ২০২৬, ৫:১০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ২৯, ২০২৪, ১২:৩৮ অপরাহ্ণ
সোনাইমুড়ীতে মাদ্রাসায় ঘটছে বলাৎকার, সালিশে হচ্ছে ধামাচাপা

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার অলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বেসরকারি মাদ্রাসা। নানা চটকদার বিজ্ঞাপন আর আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বলে প্রচার করা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানলোকে। তবে এসকল প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে সরকারি কোন নীতিমালা ও মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন সময় ঘটছে বলাৎকারের ঘটনা। মাঝেমধ্যে মাদ্রাসাগুলোতে শিশু শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মত ঘটনাও ঘটছে। আর মাদ্রাসায় বলাৎকার অথবা আত্মহত্যার ঘটনা সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে ধামাচাপা।
গত শনিবার (২৫ মে) সোনাইমুড়ী কলেজ গেট সংলগ্ন আন নূর তাহফিজুল কুরআন মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক নুরুল আফছারি পলাতক রয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা বাদী হয়ে সোনাইমুড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
জানা যায়, গত বছর এই শিক্ষার্থীকে মাদ্রাসাটির অন্য আরেক শিক্ষক বলাৎকার করেন। তখন ওই ঘটনা ধামাচাপা দিতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে শালিস করতে বাধ্য করা হয় শিক্ষার্থীর পরিবারকে। এছাড়া ওই প্রতিষ্ঠানে এর আগেও বিভিন্ন সময় শিশু বলাৎকারের ঘটনা ঘটেছে। তবে লোকলজ্জার ভয়ে অধিকাংশ অবিভাবকেরা বিষয়টি চেপে যান।
ভুক্তভোগী শিশুর মা সুলতানা পারভীন জানান, এই মাদ্রাসায় শিশুদের বলাৎকার সহ শারিরিক-মানুষিক ভাবে নির্যাতন করা হয়। তবে এসব ঘটনাকে মাদ্রাসার পরিচালক সবসময় প্রপাগান্ডা বলতেন। গত বছর এই প্রতিষ্ঠানে তার ছেলের সাথে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তখন ওই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আনোয়ার হোসেন এবং কয়েকজন শিক্ষকেরা তার ছেলেকে ঘটনাটি না ভয়ভীতি দেখায়। ওই মাদ্রাসার দুই জন শিক্ষক পরে সুলতানা পারভীনকে বিষয়টি মুঠোফোনে জানায়। ঘটনা জানতে পেরে মামলা করতে গেলে স্থানীয় কিছু নেতা বাঁধা দেয়। তারা বিষয়টি নিয়ে বাজারে সালিশ বসিয়ে প্রভাব খাটিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়। আর মাদ্রাসার বিষয়ে তারা মনিটরিং করবে বলে মিমাংসা করে। গত শনিবার তার ছেলে আবারো বলাৎকারের শিকার হলে তিনি সোনাইমুড়ী থানায় অভিযোগ দেন। তবে অভিযুক্ত ওই বলাৎকারকারী শিক্ষক নুরুল আফছারিকে মাদ্রাসার পরিচালক আনোয়ার হোসেন কক্সবাজারে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ করেন।
পাশবিকতার শিকার ওই শিশু কাঁদতে কাঁদতে বর্ণনাদেয় তার ওপরে ঘটা নির্যাতনের। শিশুটি জানায় সে কোরআনের ১২ পারার হাফেজ। ২০২০ সাল থেকে এই মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগে পড়ছে। এর আগেও গতবছর একবার তাকে বলাৎকার করা হয়। সেসময় ভয়ে সে কাউকে কিছু জানাতে পারেনি। গত শনিবারের ঘটনার বিষয়ে সে বলে, “সকাল ছয়টায় হুজুর এসে বলেন যে আমার আম্মা এসেছেন। এই বলে আমাকে অফিসের ভেতরের একটি রুমে নিয়ে যায় যেখানে কোন সিসি ক্যামেরা নেই। ওখানে আমার ওপরে অত্যাচার করে। আমার মুখ চেপে ধরে। বলেছে এই কথা কাওকে বললে আমাকে মেরে ফেলবে।”
ভুক্তভোগী শিশুর নানা জানান, গত বছরে এই মাদ্রাসায় তার নাতি বলাৎকারের শিকার হয়। সেসময় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বসে সালিশের মাধ্যমে সমাধান করেন। বড় হুজুর আনোয়ার হোসেন সেই সময় তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানায় এবং শিশুটিকে নিজের ছেলের মত দেখাশোনা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। গত শনিবার (২৫ মে) ভোরে অবারো ওই শিশুকে বলাৎকার করেন হেফজ বিভাগের এক শিক্ষক। ভুক্তভোগী শিশু বিষয়টি মাদ্রাসার বড় হুজুরকে জানায়। মাদ্রাসার বড় হুজুর শিশুটির অসুস্থ বলে মুঠোফোনে তার অভিভাবকদের জানান। পরে বাচ্চাটিকে বাড়িতে আনলে সকলে ঘটনা জানতে পারেন।
তথ্য বলছে, ব্যাঙ্গের ছাতারমত গজিয়ে ওঠা উপজেলার কয়েকশো মাদ্রাসার সরকারি ভাবে মনিটরিং এর কোন ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ সড়ক, অলি-গলি ও আবাসিক ভবনের সামনে ঝোলে চোখজুড়ানো নানা নামের মাদ্রাসার বিলবোর্ড। সেসকল প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোতে আবার রয়েছে আবাসিক, অনাবাসিক, ডে-কেয়ার ও নূরানী শিক্ষা সহ মানসম্মত শিক্ষার চটকদার বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন আবাসিক রুম, ফ্লাট ভাড়া নিয়ে বদ্ধ পরিবেশে গড়ে উঠছে আন্তর্জাতিক মানসম্মত বলে প্রচার করা তাথাকথিত মাদ্রাসাগুলো। ফ্লাটের দরজা আটকে বদ্ধ পরিবেশে চলে কার্যক্রম। নেই শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ, অভিজ্ঞ শিক্ষক, খেলাধুলার মাঠ। এসকল ফ্লাটের মধ্যে পরিচালিত আবাসিক মাদ্রাসায় শিশুদের খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীদের মানুষিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের শারিরিক শাস্তির বিরুদ্ধে নির্দেশ থাকলেও মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের মারধোর চলে কোন রাখঢাক ছাড়াই। খেলাধুলার পরিবেশ কিংবা বিনোদনের আয়োজন না থাকা, পিতামাছা ছাড়া বদ্ধ পরিবেশ, শিক্ষক কর্তৃক বলাৎকার, বলাৎকারের ঘটনা ধামাচাপা দিতে শিশুর ওপরে শারীরিক-মানসিক ও পাষবিক নির্যাতনের ঘটনায় এসকল কোমলমত শিশুদের অনেকে মাদ্রাসা থেকে পলায়ন সহ আত্মহত্যার মত ভয়া্বহ পরিনামের দিবে ধাবিত হয়ে থাকে।
এর আগে গত বছরের (২১ এপ্রিল) উপজেলার বাইপাস এলাকার মারকাযুল হুফফায ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের ঘটনা ঘটে। একই ভাবে বলাৎকারের দায়ে অভিযুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক মোঃ সাহাদাৎ হোসেন পালিয়ে যান। পরে মারকাযুল হুফফায ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার পরিচালক হাফেজ মাওলানা আমির হামজা বলাৎকারের শিকার শিশুটির পরিবারকে ম্যানেজ করে ঘটনা ধামাচাপা দেয়।
এর কিছুদিন পর মারকাযুল হুফফায ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার এক শিশু শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই মৃত্যুর ঘটনা হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হলেও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি ধামাচাপা হয়ে যায়। ধর্মীয় অনুভূতির অযুহাতে শিশুর বাবা-মা কোন অভিযোগও করেনি থানায়।
- মোহাম্মদ হানিফ-
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.