
শাহজাহান সাজু, কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের লিচু, দেশের অন্যতম সুস্বাদু সেরা জাতের লিচু। এই লিচু রসে টুইটম্বুর স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় খেতে সুস্বাদু আকারে অনেটাই বড়। বাতাসের তালে, গাছের পাতার ফাঁকে লাল হয়ে দোলছে আর দোলছে। দেখে যেন জিভে জল এসে যায়। জ্যৈষ্ঠ মাসের মিষ্টি ফলের সমারোহ আর মৌ মৌ গন্ধ জানান দেয় এটা মধুমাস। আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস আর জামের সমারোহ এখন গ্রামে গ্রামে।
পাকুন্দিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারগুলোতে মৌসুমী ফল ক্রয়-বিক্রয়ে এখন উৎসবের আমেজ। বাজারে অনেক জাতের লিচু উঠলেও লোকজনের চোখ থাকে মঙ্গলবাড়িয়ার সুস্বাদু লিচুর দিকে। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরাও মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু বিক্রি করে অতিরিক্ত টাকা উপার্জন করেন। মজার ব্যাপার হলো, মঙ্গলবাড়ীয়ায় লিচু বাগান থেকেই কাড়াকাড়ি করে নিয়ে যায় লোকজন। রসালো, সুমিষ্ট, সুন্দর গন্ধ ও গাঢ় লাল রঙের বৈশিষ্ট্যের কারণে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর খ্যাতি দেশজুড়ে। তীব্র তাপ প্রবাহের কারণে এবার এ লিচুর ফলন কিছুটা কম হলেও মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের বাগানগুলোতে ‘লিচুবিলাসীদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের সবচেয়ে বড় লিচু চাষি তৌহিদুর রহমান।
তার ১২৮টি লিচু গাছ আছে। তিনি কয়েক লক্ষাদিক টাকার লিচু বিক্রি করবেন বলে আশা করছেন। বাজারের সাধারণ ১০০ লিচু ২০০/৩০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও মঙ্গলবাড়িয়া লিচু দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। চাষিদের মতে প্রতিটি গাছে ১০ থেকে ১২ হাজার লিচু উৎপন্ন হয়ে থাকে এবং একেক মৌসুমে মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে প্রায় তিন কোটি টাকার মতো লিচু বিক্রি হয়ে থাকে। লিচু চাষিরা জানিয়েছে, লিচুর জন্য ফরিয়া ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা দিয়ে রেখেছে তাদের। শুধু দেশে নয়, বিদেশে আত্মীয়স্বজনের কাছেও পাঠানো হচ্ছে এ লিচু। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে অন্তত ছয় থেকে সাত হাজার লিচু গাছ আছে। প্রায় ২০০ বছর আগে এ গ্রামে লিচু চাষ শুরু হয় বলে জানা যায়।
পরে তা পুরো গ্রাম এমনকি আশপাশেও ছড়িয়ে পড়ে। সাফল্য দেখে অনেক কৃষক ধানি জমিতেও লিচুর বাগান গড়ে তুলেছে। মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের সবুজ জানান, কেবল কিশোরগঞ্জ নয়, দেশের অন্যান্য জেলায়ও মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর বাড়তি চাহিদা রয়েছে। আর এ কারণেই লিচুর মৌসুমে স্থানীয় বাজারে এসব লিচু পাওয়া যায় না। চলে যায় দেশের বড় বড় জনবহুল শহরে। দামও অন্য জাতের লিচুর চেয়ে বেশি। মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু আকারে যেমন বড় হয়, রঙে, স্বাদে-গন্ধেও হয় ব্যতিক্রমী গুণের অধিকারী। যে কারণে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর একটি বাড়তি কদর ও চাহিদা রয়েছে। পাইকাররা এখান থেকে লিচু কিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যায়। যে ১০০ লিচু আগে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হত সেই লিচু এখন ৩শ থেকে ৪শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ লিচু কেনার জন্য পাইকারদের পাশাপাশি প্রতিদিন এলাকায় প্রাইভেটকারেও চলে আসছেন অভিজাত গ্রাহকরা। এছাড়াও সিঙ্গাপুর, কুয়েত, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, লন্ডন, আমেরিকা, জার্মান, অস্ট্রেলিয়াসহ বাংলাদেশি প্রবাসীদের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে মঙ্গলবাড়িয়ার এ সুস্বাদু লিচু। স্থানীয়রা জানায়, ব্রিটিশ আমলে এ গ্রামের জনৈক দারোগা সদূর চীন থেকে এই জাতের লিচু সর্বপ্রথম রোপণ করেন। এরপর থেকে এ লিচুর স্বাদ, গন্ধ, সুস্বাদু দেখে পুরো মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে লিচু চাষ। এ গ্রামের সবাই লিচু চাষে এখন স্বাবলম্বী। গ্রামের লিচু চাষীদের সহস্রাধিক লিচু গাছ রয়েছে। মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতেই কমবেশি লিচু গাছ রয়েছে। এক কথায় একরামের সবাই সুস্বাদু লিচু চাষের যুক্ত রয়েছেন। দিনদিন এর ব্যাপকতা বেড়েই চলছে। মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর সঠিক জাত জানা সম্ভব হয়নি। তবে গ্রামের নামানুসারে একে ‘মঙ্গলবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী লিচু বলে দেশ বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছে।

আরও পড়ুন
বগুড়া মহাস্থান মাজারের ১৫ দানবাক্সে মিলল সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা, গণনায় লেগেছে প্রায় দুই দিন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার
নওগাঁয় সরকারি কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা করায় যুবক আটক