হোম » সারাদেশ » বঙ্গবন্ধুর আজীবন সহচর শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের ৯৯ তম জন্মদিন আজ

বঙ্গবন্ধুর আজীবন সহচর শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের ৯৯ তম জন্মদিন আজ

শাহজাহান সাজু, কিশোরগঞ্জ: মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলার বুলবুল নামে খ্যাত সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর। তিনি মুক্তিযুদ্ধের আগে বঙ্গবন্ধুর ডাকে রাজনীতির কারণে চষে বেড়িয়েছেন সারা দেশ। দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণাঞ্চল পূর্ব থেকে পশ্চিমাঞ্চল। তার ছিল ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসব এলাকা সফর করার সময় সফরসঙ্গী করতেন সৈয়দ নজরুল ইসলামকে। সেখানকার মিছিল-সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি স্লোগান উঠত সৈয়দ নজরুল ইসলামের নামেও।
সৈয়দ নজরুল-বাংলার বুলবুল এ স্লোগানে মুখর হতো দেশের গোটা জনপদ। সৈয়দ নজরুল ইসলামের জন্ম কিশোরগঞ্জ শহরের ৩ কিলোমিটার পূর্বে যশোদল ইউনিয়নের শ্যামল ছায়ার নিভৃতপল্লী বীরদামপাড়া গ্রামে ১৯২৫ সালে (১৮ ফেব্রুয়ারি)। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ আব্দুর রইস এবং মা সৈয়দা নূরুন্নাহার খাতুন। সরকারি চাকুরে বাবা এলাকায় রইস মিয়া সাহেব নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন।
তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি। সৈয়দ নজরুল ইসলামের বাল্যকালের ডাকনাম ছিল গোলাপ। কিশোরগঞ্জে তার বাল্যশিক্ষা শুরু হয়। পরে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল এবং আনন্দ মোহন কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে যথাক্রমে প্রবেশিকা ও আইএ পরীক্ষা পাস করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে এমএ এবং ১৯৫৩ সালে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৯ সালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কর বিভাগে অফিসার পদে যোগদান করেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা সৈয়দ নজরুলের সরকারি কর বিভাগে চাকরি মনে ধরেনি। দুই বছরের মধ্যে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে আনন্দ মোহন কলেজে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। কিছুদিন পর এ পেশা ছেড়ে আইন ব্যবসায় এবং রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছাত্রজীবনেই রাজনীতি ও দেশসেবার ব্রত নিয়ে উজ্জীবিত হন। ১৯৪৬-১৯৪৭ সালে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের সময় গঠিত সর্বদলীয় অ্যাকশন কমিটির সদস্য হিসেবে ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৫৭ সালে খ্যাতিমান রাজনীতিক, সুসাহিত্যিক ও পাকিস্তানের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আবুল মনসুর আহমদকে কাউন্সিলের মাধ্যমে হারিয়ে ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৪ সালে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে সমাসীন ছিলেন।
বাঙালির মুক্তিসনদ ছয় দফা প্রণীত হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানকে বারবার কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। দিনে দিনে স্বাধিকার আন্দোলন প্রবলভাবে বেগবান হতে থাকে। ওই সংকটময় সময়ে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতির (১৯৬৬-১৯৬৯) গুরুদায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের উপনেতা নির্বাচিত করা হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সৈয়দ নজরুল ইসলাম তা রক্ষা করে গেছেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর গোটা জাতি এক ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হয়। শুরু হয় গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ।
মুজিবনগরে গঠন করা হয় অস্থায়ী সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি আর সৈয়দ নজরুল ইসলামকে করা হয় ওই সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুলের কাঁধেই বর্তায় মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রবাসী সরকার পরিচালনার দায়িত্বভার। কারামুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশে ফিরে আসার পর সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হলে নতুন সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হন সৈয়দ নজরুল। ১৯৭৩ সালে নতুন সরকার গঠিত হলে তিনি একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশে সংসদীয় পদ্ধতির স্থলে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা চালু করা হলে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম হন উপরাষ্ট্রপতি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হয়ে পুরোনো সহকর্মীর কয়েকজনকে তার মন্ত্রণালয়ে অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু সৈয়দ নজরুলসহ জাতীয় চার নেতা তার মন্ত্রিসভায় যোগদানে অস্বীকৃতি জানালে ২৩ আগস্ট তাঁদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে বন্দি করা হয়।
৩ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাত্র আড়াই মাস পর জেলহত্যার এ ঘটনায় পুরো দেশ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। নৃশংস এ ঘটনার আগে দেশবাসী বুঝতেই পারেনি, এভাবে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর আজীবন সহচর শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম এর ৯৯ তম জন্মবার্ষিকীতে তার অমর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। দেশ মাতৃকার অকুতোভয় বীর সেনানী শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম পরপারে ভালো থাকুন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে বেহেস্ত নসিব করুন আমিন।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!