প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৫, ২০২৬, ১:৪৪ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৪, ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
মৃত্যুর খবর শুনলেই ঘোড়া নিয়ে ছুটে চলেন মনু মিয়া, খুঁড়েছেন তিন হাজার কবর

শাহজাহান সাজু, কিশোরগঞ্জ: জীবনের শেষ ঘর কবরটি বেশ কারুকার্যে সাথে তৈরি করেন কারিগর মনু মিয়া (৭২) তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের বাসিন্দা। মানুষের জীবনের শেষ অন্তিম ঠিকানা তৈরির কারিগর মনু মিয়া৷ একে একে তিন হাজার কবর খুঁড়েছেন তিনি৷ মৃত্যুর খবর শুনলেই ঘোড়া নিয়ে ছুটে চলেন তিনি৷ মনু মিয়ার মায়ের মৃত্যুর পর জীবনে আসে পরিবর্তন৷ মায়া মমতার অভাব তাকে তাড়া করে ফিরতে শুরু করে।
নিজেকে বদলানোর সংকল্প ব্যক্ত করেন। অন্যের মৃত্যুর সংবাদ শুনলে তার মায়ের মুখ ভেসে ওঠে মনের মধ্যে মনু মিয়ার৷ যে মাটির ঘরে তার মা শুয়ে আছে সেই ঘর তৈরি করে দিবেনকে মানুষকেও। বদলে যাওয়ার মিছিলে নিজেকে শামিল করলেন। কবর খননকারী মনু মিয়া বলেন, আমি তখন কিছুই বুঝতে পারিনি। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, আমি যেন আমার মায়ের শেষ ঠিকানাটা সাজিয়ে দিচ্ছি। এরপর থেকে যখনই সুযোগ পেয়েছি, তখনই তাদের সঙ্গে কবর খননের কাজে অংশ নিয়েছি। এভাবে একসময় এ কাজটার প্রতি আমার অন্যরকমের একটি ভাললাগা জন্মে গেল। কোনো কারণে যদি একটি কবর খোদায় শরিক হতে না পারতাম, মনে হতো কি যেন মিস করেছি।
মনু মিয়া জানান, তিনি ছোটবেলায় স্থানীয় গোরখোদকদের সঙ্গে প্রথম প্রথম আত্মীয়স্বজনের কবর খননের কাজে অংশ নিতেন। ক্রমশ দক্ষতা বাড়তে বাড়তে এক সময় এ কাজটিকেই তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর থেকে টানা ৪২ বছর ধরে অকৃত্রিম আবেগে তিনি নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন কবর খননের কাজে। একজন নিখুঁত সুদক্ষ গোরখোদক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে। কবর খনন করার জন্য নিজের খরচায় তিনি খুন্তি, কোদাল, দা, করাতসহ সমস্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করে নিয়েছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ কাজে তার পারদর্শিতা এবং আন্তরিকতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। নিজ গ্রাম বা দূরবর্তী গ্রাম, যেখান থেকে যখনই কারো মৃত্যু সংবাদ পান, আবেগতাড়িত দরদ নিয়ে ছুটে যান মনু মিয়া। তিনি কবর খোঁড়ার বিনিময়ে কারো কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেন না। এমনকি যাতায়াত খরচটুকুও না। আর এ কারণেও মনু মিয়া পাচ্ছেন মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সম্মান।
তিনি নিজেও বার্ধক্যের কিনারায় দাঁড়িয়ে। ফলে কবর খোঁড়ার কাজে তিনি নিয়োজিত হন এক বিষাদময় আবেগে। জানা যায়, তিনি ঢাকার বনানী কবরস্থানসহ দেশের নানা প্রান্তে গোর খনন করে এ পর্যন্ত ২৬৫০টি গোর খনন করেছেন। কোথাও বেড়াতে গিয়ে যদি কারো মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছেন তো তিনি সেখানে ছুটে গিয়ে গোর খননে শামিল হয়েছেন। এমনো হয়েছে, ভীষণ অসুস্থ অবস্থায় তিনি বিছানা ছেড়ে ওঠতে পারছেন না। কিন্তু কারো মৃত্যু সংবাদ তার কানে এসেছে, সে অবস্থায় তিনি কবরস্থানে ছুটে গিয়ে তার গোর খনন করেছেন। শুরুর দিকে তার স্ত্রী রহিমা বেগম মাঝে মাঝে এ বিষয়ে কথাবার্তা বললেও মনু মিয়ার এ কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতার কারণে তিনিও স্বামীকে যতটা সম্ভব মানসিক সমর্থন দিয়ে চলেছেন। উদাসীন ও সাদা মনের এ মানুষটি আমৃত্যু তার এ কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রাখেন। তার মতে, মানুষের জন্য এমনিতে কিছু করতে না পারলেও তার শেষ ঠিকানাটা তো সাজিয়ে দিতে পারছেন। আর এটাই তার সুখ। মনু মিয়া আরো জানান, এ কাজ করতে গিয়ে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের নিকট থেকে যে ভালোবাসা পাচ্ছেন, এটাও তার পরম শান্তির। তাই শরীরে শক্তি-সামর্থ্য থাকলে আমৃত্যু এ কাজটি তিনি চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রাখেন।
দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে নিজের ধানিজমি বিক্রি করে কিনেছেন একটি ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে যাবতীয় হাতিয়ার-যন্ত্র তুলে নিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই শেষ ঠিকানা সাজাতে মনু মিয়া এখন ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামে। মনু মিয়া বলেন, আমি সেই দিনটির অপেক্ষায় আছি, যখন আমার কবর খনন করার জন্য আমারই মতো কেউ নিঃস্বার্থ মন নিয়ে খুন্তি-কোদাল হাতে এগিয়ে আসবেন। মনু মিয়ার স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন, এমনও হয়েছে, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি (মনু মিয়া) বিছানা ছেড়ে ওঠতে পারছেন না। এরকম অবস্থায়ও কারো মৃত্যু সংবাদ কানে এলে ছুটে গেছেন কবর খুঁড়তে। তাদের কোনো সন্তান নেই। মানুষের ভালোবাসাই সন্তানের চেয়েও তাদের বড় সম্পদ বলে মন্তব্য করেন রহিমা বেগম।
বহু মানুষের কবর খুঁড়েছেন জানিয়ে মনু মিয়া বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, রাষ্ট্রপতির ছোট ভাইসহ বহুজনের কবর খুঁড়েছি। শরীর ভালো থাকলে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কবর খুঁড়তে চাই। সবচেয়ে খারাপ লাগছিল মায়ের কবর খুঁড়তে গিয়ে। আরেক দুঃখ রয়েছে যে, বাবার কবর খুঁড়তে পারি নাই। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মনু ভাই খুব ভালো মানুষ। আমরা ছোট সময় থেকেই দেখে আসতেছি তিনি বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের কবর খুঁড়েন। উনার মতো এমন ভালো মানুষ আমাদের এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছে এতেই আমরা গর্বিত।
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.