
মোঃ মনিরুল ইসলাম: উত্তরবঙ্গের প্রবেশদার খ্যাত সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারী আকবর আলী কলেজ। স্বাধীনতার প্রাককালে ১৯৭০ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং পরবর্তিতে ১৯৮৪ সালে এটি সরকারী করন করা হয়। কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন উল্লাপাড়া ও সলঙ্গার দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য এম আকবর আলী। মাত্র ৩০ বছরের একজন তরুন ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও শিল্পপতি এম আকবর আলী এ অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার কথা চিন্তা করে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন উল্লাপাড়া উপজেলাতে আর কোন কলেজ ছিলনা। তখনকার দিনে পায়ে হেটে ও রেলপথে দীর্ঘ সময় নষ্ট করে ছাত্রছাত্রীদের সিরাজগঞ্জ অথবা পাবনাতে গিয়ে কলেজ করতে হতো। প্রতিষ্ঠাতা নিজেও এভাবে কষ্টকরে পায়ে হেটে সিরাজগঞ্জ কলেজে পড়ালেখা করে ৬০ এর দশকে এমএ পাশ করেছেন। পরবর্তীতে বড়হড় স্কুল এন্ড কলেজ এবং উল্লাপাড়া বিজ্ঞান কলেজটিও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লাপাড়া বিজ্ঞান কলেজটি বর্তমানে রেজাল্ট এর দিক থেকে রাজশাহী বোর্ডে সেরা বিশ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবসময় অবস্থান করে থাকে। পাবনা-রংপুর মহাসড়কের পাশে উল্লাপাড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে কলেজটি অবস্থিত। মোট ১০.৩২ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত কলেজটির দৃষ্টি নান্দনিকতা খুব সহজেই সকলের মন কারে। সুবিশাল ক্যাম্পাস, অনেক বড় পুকুড় ও খেলার মাঠ কলেজটিকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় এনে দিয়েছে। এই খেলার মাঠে অনেক বড় বড় ক্রিকেট ও ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন হয়ে থাকে। এছাড়াও প্রতিবছর উপজেলা প্রশাসনের তত্ত¦াবধানে রাষ্টীয় সকল প্রোগ্রাম যেমন-স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, আনÍর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, জাতীয় শোক দিবসসহ সকল সরকারী অনুষ্ঠানসমূহ এই সরকারী আকবর আলী কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
দেশের সংগীত, সাংস্কৃতিক অঙগনে এ কলেজের অনেক ভুমিকা রয়েছে। কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য অনেক আগে থেকেই একটি সুবিশাল হলরুম রয়েছে। এই হলরুমে একসময় বিশেষ করে ৮০ ও ৯০ এর দশকে নিয়মিত নাটক, থিয়েটার ও সিনেমার প্রদর্শন হতো। সরকারী আকবর আলী কলেজের সাবেক ছাত্র ‘রিমঝিম কচিকাচার মেলা’ উল্লাপাড়ার প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহাদত হোসেন মাষ্টার যিনি কিনা মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন তাঁর পরিচালনায় নব্বই দশকের আলোচিত নাটক ‘অপুর জিজ্ঞাসা’এই হলরুমে মঞ্চায়িত হয়। যেখানে অভিনয় করেন তখনকার ছাত্র সাইদুল মাষ্টার, নজরুল মাষ্টার, শহিদুল, শফি, বাবু, অমল প্রমূখ। দেশবরেন্য নাট্য ব্যক্তিত্ব মান্নান হীরা ও সংগীত জগতের জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী সুমন বাপ্পী ও ইমন খান কিন্তু এই সরকারী আকবর আলী কলেজ থেকেই উঠে এসেছেন। এছাড়া দেশের নামকরা ফুটবলার আবদুল্লাহ ও মন্ত্রি সরকারী আকবর আলী কলেজের ছাত্র। দেশের স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে সরকারী আকবর আলী কলেজের অবদান আরও সমৃদ্ধ। কলেজটিতে প্রতি ২ বছর অন্তর অন্তর ছাত্র সংসদের নির্বাচন হতো। ৭০, ৮০ এবং ৯০ এর দশকে কলেজের ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঈদের মতো আনন্দ, উৎসব, প্রচারনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। বেলাল-বকুল পরিষদ, আলম-মারুফ পরিষদ কিংবা আশরাফ-রফিক পরিষদগুলি সরকারী আকবর আলী কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সেই রমরমা সোনালী অধ্যায়গুলো মনে করিয়ে দেয়।
উল্লাপাড়া পৌরসভার বর্তমান মেয়র মোঃ নজরুল ইসলাম ও সাবেক দুইবারের মেয়র মোঃ বেলাল হোসেনসহ এখন পর্যন্ত যে কয়জন মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তারা সবাই সরকারী আকবর আলী কলেজ ছাত্র সংসদের হয় ভিপি নাহয় জিএস ছিলেন। এছাড়াও উপজেলা চেয়ারম্যানগনদের মধ্যে অনেকেই সরকারী আকবর আলী কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি অথবা গুরুত্বপূর্ন প্রতিনিধি ছিলেন। সাবেক পৌরমেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান প্রয়াত মারুফ বিন হাবিব সরকারী আকবর আলী কলেজ ছাত্র সংসদের একবার জিএস ও দুইবার ভিপি ছিলেন। উল্লাপাড়া ও সলঙ্গার সদ্য বিলুপ্ত দুইবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা গাজী শফিকুল ইসলাম শফি এই সরকারী আকবর আলী কলেজের প্রথমদিকের ভিপি ছিলেন। সরকারী আকবর আলী কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রথম দিকে জাসদ ছাত্রলীগ এবং পরবর্তিতে আওয়ামী ছাত্রলীগের সাফল্য বেশী ছিল। অবশ্য আশরাফ-রফিক পরিষদের সুবাদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও মাঝে একবার সফলতা পেয়েছে। নির্বাচনী ড্রামাডোল, ছাত্র রাজনীতি ও উপজেলার একমাত্র কলেজ হওয়ার কারনে সরকারী আকবর আলী কলেজকে একসময় এ অঞ্চলের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বলা হতো। ৭০, ৮০ এবং ৯০ এর দশকে সরকারী আকবর আলী কলেজে পড়ালেখা করাটা ছাত্রছাত্রীদের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। এই কলেজে ছাত্রীদের জন্য একটি কার্যকরী ও আকর্ষনীয় কমনরুম রয়েছে এবং বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের জন্য কম্বাইন্ড ক্লাশরুম ‘গোপাল’ সরকারী আকবর আলী কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটা বড় আবেগের জায়গা। এছাড়াও আরও একটি বড় মজার বিষয় হল উল্লাপাড়া শহরে সেই সময়ে ৫টি সিনেমা হল ছিল। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবারে হলগুলোতে নতুন নতুন সিনেমা আসতো এবং ছাত্রছাত্রীরা দলবেধে সিনেমা দেখতে যেতো। বিশেষকরে শনিবারগুলোতে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সহপাঠিদের সঙ্গে সিনেমা দেখাটা ছিল এই কলেজের ছাত্রছাত্রীদের একটা বড় আকর্ষনের বিষয়।
৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সরকারী আকবর আলী কলেজের ভুমিকা আরও বি¯ৃÍত, প্রশংসিত ও দেশব্যাপী আলোচিত ছিল। দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো এ কলেজের ছাত্ররাও স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অনেক বড় ভুমিকা পালন করেছেন। ১০ অক্টোবর ১৯৯০ সালে ঢাকার দৈনিক বাংলা মোড়ে মিছিলরত অবস্থায় সরকারী আকবর আলী কলেজের তৎকালীন ছাত্র নাজিরুদ্দিন জেহাদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়ে ছিলেন। ৯০ এর গনতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে জেহাদ সরকারী আকবর আলী কলেজের বিএ শেষ বর্ষের ছাত্র এবং কলেজ শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি ও উপজেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন। নব্বইয়ের ১০ অক্টোবর বিভিন্ন রাজনৈতিকদল ও বিএনপিসহ ৭ দলীয় জোট রাজধানীর পল্টনে মহাসমাবেশের ডাক দিলে অকুতভয় ছাত্রনেতা জেহাদ সরকারী আকবর আলী কলেজের ৬০ জন ছাত্র নিয়ে উক্ত সমাবেশে যোগদান করেছিলেন। সেইদিনের উত্তাল ও ভয়াবহ সংগ্রামে জেহাদের সহযোদ্ধা হিসেবে তার মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন সরকারী আকবর আলী কলেজের সেই সময়কার ডাক সাইডের ছাত্রনেতা আব্দুর রাজ্জাক সন্টু, শফিউল মোমেন শফি, মাহবুব, আজাদ, হেলাল, মোহাব্বাত, জেহাদের আপন ছোটভাই শহিদ প্রমূখ। জেহাদের সেই দিনের শাহাদত বরন ছাত্রদের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়ে ছিল। ছাত্ররা জেহাদের লাশ নিয়ে মিছিল মিটিংসহ দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে ছিলেন যার ফলে জেহাদের মৃত্যুর ৫৬ দিনের মাথায় স্বৈরাচার এরশাদের চুড়ান্ত পতন হয়েছিল।
ছবি সংগৃহিত ঃ সরকারী আকবর আলী কলেজ, উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ ।
কলেজটির একসময়কার নামকরা প্রিন্সিপাল ছিলেন প্রয়াত আবু তাহের। সাবেক এই প্রিন্সিপালের নামে কলেজের একমাত্র ছাত্রাবাসের নামকরন করা হয়েছে। এছাড়াও ছাত্রীদের জন্য কলেজ ক্যাম্পাসের অভ্যান্তরে ছাত্রী হোস্টেল এবং নামাজের জন্য দৃষ্টি নন্দন মসজিদ রয়েছে। কলেজটিতে ইন্টারমিডিয়েট, ডিগ্রি (পাশকোর্স) এর পাশাপাশি ১৪ টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু আছে। কলেজটিতে ১০ হাজারেরও বেশী ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, বিজ্ঞান ক্লাব, ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব প্রভৃতি চালু আছে। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে সরকারের সিইডিপি প্রকল্পের আওতায় ক্যাম্পাস নেটওয়ার্কিং, ডিজিটাল ক্লাশরুম, ভার্চুয়াল লাইব্রেরী, আধুনিক ল্যাংগুয়েজ ল্যাব ও ছাত্রদের বায়োমেট্রিক হাজিরাসহ অফিস অটোমেশন এর প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীতে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম চালু আছে।
সরকারী আকবর আলী কলেজ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু করে অর্ধশত বছর পার করেছে কয়েক বছর আগেই। এই দীর্ঘ পথচলায় কলেজটি বহু মেধাবী শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, ম্যাজিষ্টেট বা রাজনীতিবিদের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে উল্লাপাড়াকে শিক্ষা শহর বলা হয়, আর এই শিক্ষানগরীর আতুরঘর হল সরকারী আকবর আলী কলেজ। যে মানুষটির হাত ধরে এই পথচলা শুরু দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব শিক্ষানুরাগী সাবেক এমপি এম আকবর আলী। উল্লাপাড়াতে এমন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে এম আকবর আলীর অনুদান বা আবদান নেই। আপদ মস্তক একজন সৎ মানুষ হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চুতায় নিয়ে গেছেন। তিনি কিন্তু আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন অথচ ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কেউই জানতনা (কতিপয় মানুষ বাদে) সরকারী আকবর আলী কলেজের প্রতিষ্ঠা কে ? এমনও ঘটনা ঘটেছে ৮০ এর দশকে জনাব এম আকবর আলীর একজন শিল্পপতি বন্ধু তাঁর প্রতিষ্ঠানের জন্য লোকবল নিয়োগ দিচ্ছে- এক চাকরী প্রার্থীর সার্টিফিকেটে সরকারী আকবর আলী কলেজের নাম লেখা রয়েছে দেখে যথাসম্ভব তিঁনি খুশি হয়ে ঐ চাকরী প্রার্থীকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ তুমি সরকারী আকবর আলী কলেজের ছাত্র ? তোমার কলেজের প্রতিষ্ঠাতা কে ? তিনি কি বেঁচে আছেন ? উত্তরে ঐ চাকরী প্রার্থী বলেছিল না তিঁনি বেঁচে নাই- অনেক আগেই মারা গেছেন।
সমাপ্ত।
লেখকঃ
মোঃ মনিরুল ইসলাম
সিনিয়র ব্যাংকার, জনতা ব্যাংক পিএলসি.
রাজশাহী।