এখন ভাবতে হবে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে

মু, সায়েম আহমাদ: সেই ছোটকাল থেকে আমাদের সবার পরিচিত একটি বাক্য হচ্ছে শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা ছাড়া কোন দেশ বা জাতি উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌছাতে পারেনা। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত। কথাটি ঠিক যেমন বাস্তব, তেমনি অবাস্তবও বটে। কারণ এই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও যে বিভক্ত রয়েছে। আর সেগুলো হচ্ছে শহরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা। শহরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত ও আধুনিকতর। এখানকার শিক্ষার্থীরা যেমন একাডেমিক পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। এক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভিন্ন চিত্র। তারা যেমন এখানে একাডেমিক পড়াশোনার সুযোগ কম পাচ্ছে, ঠিক তেমনি বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিভিন্ন কম্পিউটার কোর্স, ইংলিশ স্পোকিং সহ আরো নানা ধরনের বিষয়ে জ্ঞান অর্জন থেকে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে। আর এসব বিষয়গুলোতে শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সহজে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে। ফলে, গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে আর এগিয়ে যাচ্ছে শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়। অনেকগুলো কারণে শহরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা পিছিয়ে রয়েছে। যেমন হচ্ছে পর্যাপ্ত জবাবদিহিতার অভাব। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সচেতন নয়। গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে কিছু শিক্ষক রয়েছেন। তারা যখন ইচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসে আবার চলে যায়। বলতে গেলে কোন দায়িত্ববোধ নেই।

কিন্তু শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। শহরাঞ্চলে পর্যাপ্ত জবাবদিহিতা আছে বলে, তারা তাদের দায়িত্ববোধ সঠিকভাবে পালন করে। ফলে শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা অর্জন করতে পারে। তাই এক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষকদের জবাবদিহিতা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি সচেতন হতে হবে। শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যথেষ্ট বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকাই। তাহলে এর বিপরীত দিক ফুটে উঠবে। এখানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব রয়েছে।

ফলে গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের থেকে পিছিয়ে পড়ছে এবং পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর এজন্যই গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করতে হবে এবং তাদেরকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন ছাড়া পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব নয়। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ার অন্যতম আরও একটি কারণ প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষার সুযোগ না থাকা। গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্র্যাক্টিক্যাল শিক্ষার সুযোগ নেই বললেই চলে। যদিও থেকেও থাকে, তবে সেটা খুব নগণ্য। তাও যে সেটা খুব কার্যকরী এমনটা কিন্তু নয়। অথচ শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্র্যাক্টিক্যাল বা ল্যাবরেটরি ক্লাসের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্র্যাক্টিক্যাল শিক্ষা অর্জন করতে পারছে আর গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে।

এক্ষেত্রে চাই গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্র্যাক্টিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থার পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করা। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। শুধুমাত্র অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে তাদের কার্যক্রম। অথচ শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন ক্লাস টেস্ট, সাপ্তাহিক ও মাসিক পরীক্ষা নিয়ে থাকে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের যথার্থ মেধা যাচাই করতে পারছে। এ দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। তাই শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ন্যায় গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতার অভাব রয়েছে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা ও টুর্নামেন্ট সহ আরো অনেক কিছু। এক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলো এসব প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।

ফলে, শিক্ষার্থীরা বিতর্ক প্রতিযোগিতাসহ অন্যান্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এমন সুযোগ পাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা সফরের আয়োজন বা উদ্যোগ নেই বললেই চলে। অথচ শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রত্যেক বছর শিক্ষা সফরের আয়োজন করা হয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে। যার ফলে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পর্যটনীয় অঞ্চলগুলোতে গিয়ে বাহিরের জ্ঞান অর্জন করতে পারে। ফলে তারা গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের তুলনায় এগিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা সফর ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করার সুযোগ করে দিতে হবে।

শহরাঞ্চলের অভিভাবকগণ তাদের সন্তানকে নিয়ে যেমন সচেতন, তেমনি গ্রামাঞ্চলের অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদেরকে নিয়ে সচেতন নয়। যেহেতু শহর ও গ্রাম্য মধ্যকার একটি প্রবল আয় বৈষম্য রয়েছে। তুলনামূলক বেশি আয়ের কারণে শহরাঞ্চলের একজন অভিভাবক তার সন্তানকে যেভাবে প্রতিটি বিষয়ের জন্য প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং এর ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের অভিভাবকের পক্ষে সেটি বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ভালো প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং এর সহজলভ্যতা, পর্যাপ্ত শিক্ষাপোকরণের প্রাপ্যতা, প্রযুক্তিগত সহায়কসহ সবদিক দিয়েই শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলের কিছু অভিভাবকের পর্যাপ্ত টাকা থাকলেও সন্তানকে শহরে পাঠিয়ে লেখাপড়া করানো ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তাদের জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষক আর পাঠ্য বইসহ, সহায়ক বই ছাড়া কোন কিছু নেই।

হয়তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান সঠিকভাবে নিশ্চিত করা গেলে অন্য কিছুর প্রয়োজন হতো না। কিন্তু সেটির ব্যবস্থা হচ্ছে না। বরং, দিনদিন পিছিয়ে পড়েছে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ ভোগ করছে শহরাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলো। অপরদিকে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো বিনিয়োগের হার প্রয়োজনীয় তুলনায় অনেক কম ভোগ করছে। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন শ্রেণিকক্ষের অভাব রয়েছে, তেমনি লাইব্রেরীর ও বিজ্ঞানাগারের অভাব রয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থ সব প্রতিষ্ঠানে সমভাবে বন্টিত হচ্ছে না। কিংবা বলা যায় প্রয়োজন অনুসারে বন্টিত হচ্ছে না। তাই শহরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন পর্যাপ্ত লাইব্রেরী ও বিজ্ঞানাগার রয়েছে ঠিক তেমনি গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এর ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার এই বৈষম্যমূলক পরিবেশ আমাদের দেশের জন্য ক্ষতিকর। যে হারে শহরাঞ্চলে শিক্ষাব্যবস্থা এগিয়ে যাচ্ছে তাতে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হিমসিম খাচ্ছে।

প্রতি বছর এস,এস,সি ও এইচ,এস,সির ফলাফল প্রকাশের পর বৈষম্যের চিত্রটি ভেসে ওঠে। তাই পরিশেষে বলা যায়, সরকারকে গ্রামঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। শহরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বারোপ করতে হবে। এগিয়ে নিতে হবে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থাকে। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থায় সব ধরণের অসঙ্গতিগুলো পরিবর্তনের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থ সব প্রতিষ্ঠানে সমভাবে বন্টন করে তা সুনিশ্চিত করতে হবে। তাহলে সম্ভব, শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলা। আর আমাদের এই সোনার বাংলা বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে বহু দূর। দেশ পৌঁছে যাবে উন্নয়নের উচ্চ শিখরে।   ছবি সংগৃহীত

মু, সায়েম আহমাদ
কলামিস্ট ও সংস্কৃতিকর্মী
আহ্বায়ক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা কলেজ শাখা