
আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে? এই প্রশ্নটি আজ শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, গণতন্ত্র, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি মৌলিক প্রশ্ন। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরও বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোন পথে এগোলে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন এবং জনগণের অধিকার একই সঙ্গে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে?
আজকের বিশ্ব একমেরু বা দ্বিমেরু নয়, বরং বহু শক্তিকেন্দ্রের প্রতিযোগিতার বিশ্ব। দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রসম্পদ, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং বৃহৎ জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বাংলাদেশের প্রতিটি বড় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন—আগামীর বাংলাদেশ কি নিজের জাতীয় স্বার্থকে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মাঠে পরিণত হবে, নাকি কোনো বিশেষ পরাশক্তির প্রেসক্রিপশনে চলবে।
বাস্তবতা হলো, কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ছাড়া চলতে পারে না। বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা জ্বালানি নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। কিন্তু সহযোগিতা আর প্রভাবাধীন হয়ে পড়া এক বিষয় নয়। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন থাকে, যখন সে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজের জাতীয় স্বার্থের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আমাদের শেখায় যে এই দেশের মানুষ পরাধীনতা মেনে নেওয়ার জাতি নয়। ভাষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ে জনগণ বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা অধিকার, ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপস করে না। এই ধারাবাহিক সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি স্বাধীন, মর্যাদাসম্পন্ন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তাই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কেবল একটি পতাকা বা একটি ভূখণ্ড নয়; বরং নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করার ক্ষমতা।
আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে যাবে—এই প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশে নির্ভর করবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। যদি রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখল ও প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে রাষ্ট্র দুর্বল হবে। আর রাষ্ট্র দুর্বল হলে বিদেশি শক্তির প্রভাব বাড়ার সুযোগও তৈরি হবে। ইতিহাস বলে, অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত রাষ্ট্র বাইরের চাপ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার ও বিরোধী দল মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করে। উন্নত বিশ্বের বহু দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের মৌলিক বিষয়গুলোতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন রাজনৈতিক পরিপক্বতা গড়ে তোলা জরুরি।
অর্থনৈতিক শক্তিই আজকের বিশ্বে রাজনৈতিক স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভর, সে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পরিসরে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা, আমদানিনির্ভর অর্থনীতি কিংবা সীমিত রপ্তানির ওপর নির্ভরশীলতা একটি দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। তাই শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি খাতের বিকাশ, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনী অর্থনীতি গড়ে তোলা আগামী বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ভারসাম্যই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। কোনো একটি পরাশক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি অন্যদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়, স্থায়ী স্বার্থই মুখ্য। বাংলাদেশেরও উচিত সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বহুমাত্রিক কূটনীতি পরিচালনা করা।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব কেবল সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেও যুক্ত। যদি কোনো রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকলেও নীতিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে।
তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিও আগামীর বাংলাদেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তরুণদের উচিত দলীয় পরিচয়ের আগে নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করা। সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, তথ্যভিত্তিক মতামত এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি একটি পরিণত রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম শর্ত।
গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাও একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান। কারণ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই নিশ্চিত করে যে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছায় নয়, বরং আইন ও জনগণের স্বার্থ অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে—এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একক রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উত্তর নিহিত রয়েছে এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে, যেখানে স্বাধীনতা হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা, গণতন্ত্র হবে জনগণের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা এবং উন্নয়ন হবে সকল নাগরিকের কল্যাণের মাধ্যম।
আগামীর বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হোক, যে বিশ্বসম্প্রদায়ের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে, কিন্তু নিজের নীতি নির্ধারণ করবে নিজস্ব প্রয়োজন, জনগণের প্রত্যাশা এবং জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে। কারণ স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য তখনই রক্ষা পায়, যখন একটি জাতি নিজের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারে।
লেখক: শাহজাহান সিরাজ সবুজ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন
মুখোশের রাজনীতি: আত্মপ্রবঞ্চনা, আদর্শহীনতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট | শাহজাহান সিরাজ সবুজ
কৃষক মরছে কীটনাশকে
স্বাধীনতার অবমূল্যায়ন: শ্রেণিতত্ত্বের আড়ালে ইতিহাস অস্বীকারের রাজনীতি