
রায়হান শেখ, মোল্লাহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল পাট। পরিবেশবান্ধব, বহুমুখী ব্যবহার এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় পাটকে বলা হয় দেশের ‘সোনালী আঁশ’। একসময় দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই ফসলকে ঘিরে আবারও নতুন আশার আলো দেখছেন বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া, সরকারি প্রণোদনা এবং বাজারে পাটের সন্তোষজনক মূল্য কৃষকদের পাট চাষে নতুন করে উৎসাহিত করেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মোল্লাহাট উপজেলায় তোষা জাতের পাটসহ প্রায় ১ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। আবাদকৃত জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে জেআরও-৫২৪, বিজেআরআই-৯ (সবুজ সোনা), ৯৮৯৭ এবং বিজেআরআই-৮। কৃষি বিভাগের আশা, অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে চলতি মৌসুমে হেক্টরপ্রতি গড়ে প্রায় ৭০ মণ পাট উৎপাদন সম্ভব হবে।
মৌসুমের শুরুতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাটের বীজ অঙ্কুরোদগম ও গাছের বৃদ্ধি খুবই ভালো হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠজুড়ে এখন দৃষ্টিনন্দন সবুজ পাটক্ষেত। আগাম আবাদ করা ক্ষেতের পাট ইতোমধ্যে ৪ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। কৃষকরা বর্তমানে পাটক্ষেতের পরিচর্যা, আগাছা দমন ও সার প্রয়োগে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
উপজেলার গিরিশনগর গ্রামের এক কৃষক জানান, সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ বছর পাটের আবাদ অত্যন্ত ভালো হয়েছে। গাছের বৃদ্ধি দেখে তিনি আশাবাদী যে ফলনও ভালো হবে। তবে কৃষক সাকিবের মতে, পাট জাগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ডোবা ও জলাশয় দিন দিন কমে যাওয়ায় কৃষকদের কিছুটা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “সময়ে জাগ দিতে না পারলে পাটের আঁশের গুণগত মান কমে যায়, ফলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।”
পাট উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নতমানের আঁশ নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে কৃষকদের বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। “উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ” প্রকল্পের আওতায় উপজেলা পাট উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে ১ হাজার ৬০০ জন কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে ২ হাজার ২০০ কেজি উন্নত জাতের পাটবীজ বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণকৃত বীজের মধ্যে রয়েছে জেআরও-৫২৪, বিজেআরআই-৯ (সবুজ সোনা) এবং ৯৮৯৭। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পাট চাষ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শও প্রদান করা হচ্ছে।
মোল্লাহাট উপজেলা পাট উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপসহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন, “বিনামূল্যে উন্নত জাতের পাটবীজ পেয়ে কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন। সরকারের এ ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকলে পাট উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।”
স্থানীয় কৃষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে কাঁচা পাটের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনায় অনেকেই এবার পাট চাষে ঝুঁকেছেন। উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভজনক হওয়ায় পাট চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। কৃষকদের প্রত্যাশা, এ বছরও তারা পাটের ন্যায্যমূল্য পাবেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ ইমরান হোসেন বলেন, “পাট বপনের সময় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ বছর পাটের আবাদ খুবই ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে তদারকি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকরা পাটের আঁশ ও পাটকাঠি উভয়েরই ভালো মূল্য পাবেন বলে আমরা আশাবাদী।”
সবুজে মোড়ানো পাটক্ষেত আর কৃষকদের মুখে আশার হাসি যেন নতুন করে জানান দিচ্ছে—সোনালী আঁশের সেই ঐতিহ্য আবারও ফিরতে শুরু করেছে। ভালো ফলন ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে মোল্লাহাটের কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন
শহীদ জিয়ার ৪৫তম শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সাকিব রাইয়্যানের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
কাউখালীতে মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার, ৪০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার
আলফাডাঙ্গায় প্রবাসীর বাড়িতে হামলা ও লুটপাট, ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল