হোম » মতামত » ভোলার উন্নয়ন স্বপ্ন ও নেপথ্যের মানুষ অধ্যাপক মোবাশ্বের আহমেদ

ভোলার উন্নয়ন স্বপ্ন ও নেপথ্যের মানুষ অধ্যাপক মোবাশ্বের আহমেদ

এএইচএম বজলুর রহমান

ভোলা বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় উপকূলীয় জেলা। নদী, চরাঞ্চল, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, গ্যাসক্ষেত্র এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ জেলার উন্নয়ন সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তবে সম্ভাবনার তুলনায় ভোলা এখনো কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের অনেকটা পেছনে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের ক্ষেত্রে জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা আজও পূর্ণ হয়নি।

একটি জেলার প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষের মৌলিক সেবাগুলো সহজলভ্য হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ কোনো বিলাসিতা নয়; বরং নাগরিক অধিকারের অংশ। ভোলার মতো দ্বীপজেলার ক্ষেত্রে এই প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। কারণ এখানকার মানুষকে চিকিৎসা বা উচ্চশিক্ষার জন্য প্রায়ই জেলা সদর কিংবা রাজধানীতে যেতে হয়, যা সময়, ব্যয় এবং দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই বাস্তবতা থেকেই ভোলায় একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি বহু বছর ধরে উঠে আসছে। একই সঙ্গে ভোলাকে পরিকল্পিত ও আধুনিক জেলায় রূপান্তরের স্বপ্নও অনেকের রয়েছে। বড় পরিবর্তনের জন্য বড় স্বপ্ন প্রয়োজন, তবে তার জন্য দরকার পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জনমত এবং ধারাবাহিক নাগরিক উদ্যোগ।

এই নাগরিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে ভোলা ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (বিডিসি) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। ভোলার উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন দাবি, মতবিনিময় এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সংগঠন ভূমিকা রাখে। আর এই উদ্যোগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন ভোলার কৃতী সন্তান অধ্যাপক মোবাশ্বের আহমেদ (এম এ বার্নিক)।

অধ্যাপক মোবাশ্বের আহমেদ কর্মজীবনে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তিনি কেবল পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। অবসরজীবনে তিনি ভোলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ইতিহাস ও উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা, গবেষণা এবং জনমত গঠনের কাজ চালিয়ে যান। তার দৃষ্টিতে উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নয়; বরং মানুষের জীবনমান, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার সমন্বিত অগ্রগতি।

তিনি ভোলা ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও নীতিনির্ধারকদের কাছে ভোলার উন্নয়ন দাবি তুলে ধরেন। বিশেষ করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চিঠি, আবেদন, স্মারকলিপি এবং মতবিনিময়ের মাধ্যমে কাজ করেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, পেশাজীবী ও নাগরিকদের নিয়ে আলোচনা ও সচেতনতা তৈরি করেন।

সমাজে নেপথ্যে কাজ করা মানুষদের অবদান অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। তারা প্রচারের বাইরে থেকে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থের কাজ চালিয়ে যান। অধ্যাপক মোবাশ্বের আহমেদ সেই ধরনের একজন মানুষ, যিনি ভোলার উন্নয়ন দাবিকে কেবল আবেগের জায়গায় না রেখে নীতিনির্ধারণী আলোচনায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন।

ভোলায় পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কেবল একটি স্থাপনা নির্মাণ নয়; এটি স্বাস্থ্য অধিকার, চিকিৎসা নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে ভোলার মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল, ঢাকা বা অন্যান্য শহরে যেতে হয়। এতে বিশেষ করে জরুরি রোগী, মা ও শিশু এবং জটিল রোগীদের জন্য ঝুঁকি ও ভোগান্তি বাড়ে।

একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু চিকিৎসাসেবাই উন্নত হবে না; বরং চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষ জনবল সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। হাসপাতালকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষার্থী এবং সেবাখাতের বিস্তার ঘটবে, যা একটি জেলার সামগ্রিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।

একইভাবে ভোলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করবে এবং তরুণদের স্থানীয়ভাবে শিক্ষালাভের সুযোগ দেবে। পাশাপাশি উপকূলীয় জীবন, নদীভাঙন, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলবে।

ভোলাকে আধুনিক জেলায় রূপান্তরের চিন্তা নতুন নয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশাসন, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং সমন্বিত নীতি। উন্নয়ন হতে হবে মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে, কেবল অবকাঠামোগত নয়।

সম্প্রতি সরকার ভোলায় পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ভোলাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছি এবং সরকারের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এটি সরকারের নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে যারা দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, তাদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে অধ্যাপক মোবাশ্বের আহমেদ (এম এ বার্নিক) দীর্ঘ সময় ধরে ভোলায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি নাগরিক উদ্যোগ, নীতিনির্ধারণী যোগাযোগ এবং জনমত তৈরির মাধ্যমে বিষয়টিকে ধারাবাহিকভাবে আলোচনায় রেখেছেন। যদিও বর্তমানে তার নাম অনেক সময় আলোচনার বাইরে থাকে, তবু এই আন্দোলন ও দাবির পেছনে তার অবদান অস্বীকার করা যায় না।

ভোলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে আসছেন। এখন প্রয়োজন এই সিদ্ধান্ত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে সর্বাধিক মানুষ এর সুফল পেতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়নকে কৃতিত্বের প্রতিযোগিতা নয়, বরং জনকল্যাণের দৃষ্টিতে দেখা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ভোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি দক্ষিণাঞ্চলের একটি শক্তিশালী উন্নয়নকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। আর এই দীর্ঘ যাত্রায় যারা নীরবে কাজ করেছেন, তাদের অবদানও ইতিহাসে যথাযথভাবে স্থান পাওয়া উচিত।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!