হোম » জাতীয় » কাউখালীতে বায়োমেট্রিক হাজিরা কেলেঙ্কারি: কয়েক লক্ষ টাকার সরকারি অর্থ লোপাট

কাউখালীতে বায়োমেট্রিক হাজিরা কেলেঙ্কারি: কয়েক লক্ষ টাকার সরকারি অর্থ লোপাট

বিশেষ প্রতিনিধি
পিরোজপুরের কাউখালীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আনা হয়েছিল বায়োমেট্রিক হাজিরা ডিভাইস। উদ্দেশ্য ছিল—শিক্ষকদের সময়মতো স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা। কিন্তু বাস্তবে এই উদ্যোগ পরিণত হয়েছে দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের কেলেঙ্কারিতে। কয়েক লক্ষ টাকার সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও ডিভাইসগুলো এখন স্কুলের দেওয়ালে ঝুলে থাকা অকার্যকর লোহার বাক্স মাত্র।

সরকারি নির্দেশনা বনাম বাস্তবতা

২০১৯ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন শাখা থেকে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বায়োমেট্রিক হাজিরা চালুর নির্দেশ আসে। নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল—বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ বাজারদর যাচাই করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মেশিন কিনবে। কোনো মধ্যসত্ত্বাভোগী বা নির্দিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে কিনতে বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু কাউখালীতে সেই নির্দেশনা অমান্য করে শিক্ষা অফিস, শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও কয়েকজন প্রভাবশালী মিলে একটি কোম্পানির মাধ্যমে একযোগে ক্রয় সম্পন্ন করে।

১৯ হাজার টাকার ডিভাইস, আসল দাম মাত্র ৪-৫ হাজার
কাউখালীর ৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৬টি বিদ্যালয়কে এশিয়ান ইলেকট্রনিক্স নামের একটি কোম্পানির কাছ থেকে ১৯,৫০০ টাকা করে ডিভাইস কিনতে বাধ্য করা হয়। মোট আদায় করা হয় প্রায় ১২ লাখ টাকা। অথচ সরবরাহ করা মেশিনগুলোর বাজারমূল্য ৪-৫ হাজার টাকার বেশি নয়। শুধু তাই নয়, চুক্তি অনুযায়ী ওয়াইফাই সংযোগ, সফটওয়্যার ও তিন বছরের সার্ভিস দেওয়ার কথা থাকলেও সেসব কিছুই দেওয়া হয়নি।

শিক্ষক-অভিযোগ বনাম কোম্পানির দাবি
৩১ নং এমই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামাপ্রসাদ বলেন, “আমরা বাধ্য হয়ে শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু ৪-৫ হাজার টাকার মেশিন বসানো হলো, কোনো সার্ভিস বা সফটওয়্যার পেলাম না। এখন মেশিনগুলো পরিত্যক্ত।”
কোম্পানির এজিএম তৌফিক হোসেন অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা চুক্তি অনুযায়ী কাজ করেছি। তবে ১৭টি স্কুল টাকা দেয়নি। তাই বাকি কাজ করা সম্ভব হয়নি।”
শিক্ষক সমিতির সভাপতি সুব্রত রায় স্বীকার করেন, “ডিভাইস আদৌ কোনো কাজে লাগেনি। আমরা শিক্ষা অফিসের পরামর্শেই একই কোম্পানি থেকে কিনেছিলাম। কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। উপরন্তু প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজনের চাপের মুখে ওই কোম্পানি থেকেই কিনতে বাধ্য করা হয়েছিল।”

প্রশাসনের অবস্থান
উপজেলা শিক্ষা অফিসার মনিবুর রহমান জানান, “ডিভাইস কেনার সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তবে কোম্পানির পক্ষ থেকে এখনো টাকা দাবি করে চিঠি এসেছে। তদন্তে দেখা যাচ্ছে, তারা চুক্তি অনুযায়ী মালামাল দেয়নি। এতে সরকারি অর্থ তসরুফ হয়েছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স্বজল মোল্লা বলেন, “এই বিষয়ে আমার জানা ছিল না। যদি প্রমাণিত হয় কোম্পানি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, তাহলে তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

টাকার অঙ্ক ও দুর্নীতির কৌশল
প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে ১৯,৫০০ টাকা করে আদায় করা হলেও বাস্তবে ৪-৫ হাজার টাকার নিম্নমানের ডিভাইস দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতি মেশিনে কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা লুট হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০-১২ লাখ টাকা বেহাত হয়েছে। শিক্ষকরা জানান, শিক্ষা অফিসে বসে স্লিপের টাকা থেকে এই অর্থ নেওয়া হয়, যাতে কোনো স্কুল এড়াতে না পারে।

বর্তমান অবস্থা: অকার্যকর ডিভাইস, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
আজ প্রায় ছয় বছর পর দেখা যাচ্ছে, মেশিনগুলো স্কুলের দেওয়ালে ঝুলে আছে, অনেক জায়গায় পড়ে আছে ধুলোমাখা অবস্থায়। শিক্ষকরা হাতে হাজিরা দিচ্ছেন, আর সরকারি টাকার লাখ লাখ টাকা গেছে দুর্নীতিবাজদের পকেটে।

তদন্ত ও ক্ষতিপূরণের দাবি
শিক্ষক ও স্থানীয়রা বলছেন, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষা অফিস, শিক্ষক নেতৃবৃন্দ এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। উপজেলা শিক্ষা অফিস ইতোমধ্যে কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!