
শাহজাহান সাজু কিশোরগঞ্জ: সাতাত্তর বছরের বিধবা আঙ্গুরা খাতুন তার একমাত্র প্রতিবন্ধী মেয়ে সাগরিকাকে নিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার বাদেশ্রীরামপুর গ্রামে একখন্ড ভূমিতে বসবাস করছেন। এলাকাবাসীর বাসা-বাড়িতে ঝি এর কাজ করে ও বিভিন্ন লোকের আর্থিক সাহায্যে খেয়ে না খেয়ে দিনগুজরান করছে এ মা-বেটি।
তাদের একমাত্র সম্বল বসতবাড়ির সাড়ে চার শতাংশ জায়গা। আর এ বসতভিটাটি জালিয়াতির মাধ্যমে রেজিষ্টি করে হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে তারই আপন বোনপুত্র মতিউর রহমান মতির বিরুদ্ধে। সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, করিমগঞ্জ উপজেলার বাদেশ্রীরামপুর মৌজার ২১৩নং আর এস খতিয়ানের ভূমি মাখনলাল সাহাগং নামে লিপিবদ্ধ আছে।
মাখনলাল সাহা পরলোকে চলে গেলে উক্ত খতিয়ানে ৫৭৭ দাগে তার স্ত্রী প্রিয়বালা সাহা নাবালক সন্তানদের পক্ষে ১৯৮৫ খ্রি.সালে জমদর আলী ও আবদুস ছাত্তারের কাছে বিক্রি করেন। আবদুস ছাত্তার একাংশের মালিক হয়ে তার অংশ ১০-১২-১৯৮৭ইং সনে আমেনা খাতুনের কাছে সাফকাওলা মূলে বিক্রি বিক্রি করেন।
আর এদিকে সহায় সম্বলহীন আঙ্গুরা খাতুন ও তার অবিবাহিত প্রতিবন্ধী মেয়ে সাগরিকা ঢাকার বাসা-বাড়িতে কাজ করে টাকা জমিয়ে ২০০১সনে ৯৯৬নং দলিল মূলে সাড়ে চার শতাংশ ভূমি ক্রয় করেন আমেনা খাতুনের কাছ থেকে। আর উক্ত আঙ্গুরা খাতুনের জমির উপর শকুনের দৃষ্টি পড়ে বোনপুত্র ভূমিদুস্যু মতিউর রহমান মতির। সে খালা আঙ্গুরা খাতুনের বাড়িতে গত দুই বছর আগে আসে।
সেখানে ১৫দিন বসবাস করে অক্ষরজ্ঞানহীন বিধবার টিপসহি নিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে চার শতাংশ বসতবাড়িটি রেজিষ্টি করে নেয়। যা আঙ্গুরা খাতুন জানেন না। আঙ্গুরা খাতুনের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে ০৯-০৫-২০২২খ্রিষ্টাব্দে জালিয়াতির মাধ্যমে মতির হাতিয়ে নেয়ার ৩৬৪২ নং দলিলটি বাতিল এবং সেই সাথে প্রতারক ও ভূমিদুস্যু মতিকে বিচারের সম্মুখিন করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে দাবী জানায় এলাকাবাসী।
এদিকে মতি জালিয়াতির মাধ্যমে নিজ নামে রেজিস্টিকৃত জমিটি সম্প্রতি স্থানীয় জাফরাবাদ ভূমি অফিসে আবেদন করে জমাখারিজের। ভূমি অফিসের তদন্তে জানা গেছে,আবেদনকৃত জমিটি মতির দখলে নেই,এবং আর এস এ অংশীদার নাবালকের সম্পত্তি মা বেআইনী ভাবে বিক্রি করেছে তা প্রমানিত হওয়ায় জমাখারিজের প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।
আর এতে মতি ক্ষুদ্ধ হয় জাফরাবাদ ইউনিয়ন ভূমির কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। বিধবা আঙ্গুরা খাতুন ও প্রতিবন্ধী মেয়ে সাগরিকা হাউমাউ করে কেঁদে সাংবাদিকদের বলেন, আমি প্রথমে জানতাম না আমার একখন্ড বসত বাড়ি মতি জালিয়াতির মাধ্যমে রেজিষ্টি করে হাতিয়ে নিয়েছে। যখন স্থানীয় জাফরাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে সরেজমিনে তদন্ত আসে তখন জানতে পারি।
এ বাড়ি হাতছাড়া হলে আমরা মা-বেটি কোথায় গিয়ে উঠবো! আমি এখন আর কাজ করতে পারি না বয়সের কারনে এবং আমার একমাত্র প্রতিবন্ধী মেয়ে সাগরিকা এলাকাবাসীর বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে তাছাড়া এলাকাবাসীর সাহায্য-সহযোগিতায় কোন রকমে দিনাতিপাত করি। বোনপুত্র হওয়ার সুবাদে আমার বাড়িতে গত দুই বছর আগে আসে একই ইউনিয়নের সাধেরজঙ্গল গ্রামের মৃত আবদুর রহমানের পুত্র মতিউর রহমান।
১৫দিন আমার বাড়িতে থেকে আমার কাছ থেকে কিভাবে আমার জায়গাটি হাতিয়ে নিয়েছে তা আমার জানা নেই। আর এখন ওই বসতবাড়িটির জায়গা খারিজ করে অন্য কারোর কাছে বিক্রি করে আমাকে উচ্ছেদ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। আমি আজ সর্বশান্ত ,আমি উক্ত প্রতারক মতির বিচার চাই । সরকারের কাছে আকুল আবেদন দলিল যদি মতি রেজিষ্টি করে থাকে তাহলে এ দলিল বাতিল চাই।
আঙ্গুরা খাতুনের প্রতিবেশী রেহেনা আক্তার বলেন, এর আগেও এই প্রতারক মতি তার নিজ মায়ের জমি প্রতারণা করে লিখে নিয়ে অন্যজায়গায় বিক্রি করেছে। পরে এ দুঃখে তার মা মারা যায়। খালা আঙ্গুরা খাতুনের কাছে এসে ১৫-২০দিন তার বাড়িতে থেকে টিপসহি নিয়ে এ বাড়ি কিভাবে নিজের নামে করেছে তা তিনি জানেন না। আরেক প্রতিবেশী সাফিয়া আক্তার বলেন,দীর্ঘদিন আগে ঢাকায় বাসা বাড়িতে আয়ার কাজ করে আঙ্গুরা এই জমিটি কিনেছিলো।
প্রতারণা করে মতি খালা আঙ্গুরার কাছ থেকে কিভাবে জমিটি হাতিয়ে নিলো তা আমরা জানি না। লোকমুখে শুনছি প্রতারণার মাধ্যমে নেয়া জায়গাটি ফেরত দিবে কিন্তু দিচ্ছে না। জমা খারিজের তদন্ত এলে আর আঙ্গুরা এতে বাঁধা দিলে আমরা জানতে পারি তার বসতবাড়ি জায়গাটি মতি হাতিয়ে নিয়েছে।
পূর্ব জাফরাবাদ গ্রামের সেলিম মিয়া বলেন, অসহায়-বিধবা এবং অক্ষরজ্ঞানহীন আঙ্গুরা খাতুন বোন পুত্র মতিউর রহমান দ্বারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কারণ যিনি দলিল দিয়েছেন তিনি জানেন না কিভাবে তার কাছ থেকে বসতবাড়ি লিখে নিয়েছে। প্রতারণার মাধ্যমে রেজিষ্টিকৃত দলিলটিও প্রশ্নবিদ্ধ! সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সুষ্ট তদন্তপূর্বক প্রতারক মতিকে বিচারের সম্মুখিন করা উচিত বলে আমি মনে করি।
জাফরাবাদ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) প্রনব কান্তি ঘোষ বলেন,মতিউর রহমানের জমাখারিজের আবেদনের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে তদন্তে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখতে পাই জায়গাটি মতিউর রহমানের দখলে নাই। এ জায়গায় বিধবা আঙ্গুরা খাতুন তার একমাত্র প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত ভোগ দখলে আছে।
তবু জোরপূর্বকভাবে মতি এ খারিজটি করে নিতে চায়। আমি জমাখারিজের প্রস্তাব দেইনি ফলে ক্ষুদ্ধ হয়ে নানা অপপ্রচার শুরু করেছে। আমি যেটা আইনতঃ তাই করেছি। এ ব্যপারে অভিযুক্ত মতিউর রহমান বলেন,্আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয় তবুও বিষয়টি নিয়ে আমি স্থানীয়ভাবে নিস্প্রত্তি করার চেষ্টা করবো।

আরও পড়ুন
‘বাড়ি জামালপুরে’—এটুকুই মনে আছে; পরিচয়হীন অসহায় নারী খুঁজছেন স্বজনদের
শহীদ জিয়ার ৪৫তম শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সাকিব রাইয়্যানের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
কাউখালীতে মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার, ৪০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার