Home » আন্তর্জাতিক » সেভেন সিস্টারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির হাব ত্রিপুরা হতে পারে
সেভেন সিস্টারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির হাব ত্রিপুরা হতে পারে

সেভেন সিস্টারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির হাব ত্রিপুরা হতে পারে

আবু আলী
ভৌগোলিক কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই সাতটি রাজ্য দেশটির অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে পিছিয়ে। দুর্বল অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এ সাত রাজ্যের মানুষ বাংলাদেশি পণ্যের ওপরই অনেকটা নির্ভরশীল। এ সুযোগ কাজে লাগানো গেলে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ হতে পারে বাংলাদেশি পণ্যের অপার সম্ভাবনার বাজার, এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এই সাত রাজ্যে পণ্যের রপ্তানির জন্য সবচেয়ে সহজেই পণ্য সরবরাহ করা যায় ত্রিপুরা থেকে। ফলে ত্রিপুরা হতে পারে সাত রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি হাব হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভৌগোলিক কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল— এই সাত রাজ্যে শিল্পায়নের বিস্তৃতি ঘটেনি। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে এই সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ ব্যয় হয় ব্যবসায়ীদের। তাই ওই রাজ্যগুলোর ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বেছে নেন বাংলাদেশকে। যোগাযোগ সহজ হওয়ায় সিলেট বিভাগের স্থলবন্দরগুলো দিয়েই তারা আমদানি করে থাকেন ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মূল ভূখন্ডের সঙ্গে এ সাত রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় সেখানে একচেটিয়া বাণিজ্যের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশি পণ্যের। ভৌগোলিক কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত সাত রাজ্য আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয়, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচলের সঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত নয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নত না হওয়ায় দিল্লিসহ অন্যান্য রাজ্য থেকে পণ্য পরিবহন করতে কয়েক দিন লেগে যায়। অন্য রাজ্য থেকে পণ্য পরিবহন করতে অতিরিক্ত খরচ হয় সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। যদি বাংলাদেশ থেকে পণ্য পরিবহন সহজতর হয় পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশ কমে আসবে। রাজ্যগুলোর অধিবাসীরা বর্তমানের চেয়ে অনেক কম মূল্যে কিনতে পারবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। বিদ্যমান কিছু জটিলতা কাটিয়ে এ বাজার ধরতে পারলে এটিও হতে পারে বাংলাদেশি পণ্যের আরেকটা বড় বাজার। বর্তমানে ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে প্রতিবছর ৭০০ কোটি রূপির পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর বিপরীতে আমদানি হচ্ছে ১৩শ রূপির পণ্য। আসামসহ উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

মেঘালয় রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী কনরাম মুকুল সাংমা বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্ভাবনা ব্যাপক। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। এতে করে উভয় দেশই লাভবান হবে। দুই দেশের উন্নয়নে সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, মেঘালয়ে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। মেঘালয়ের কৃষি পণ্যের উপর ভিত্তি করে যৌথভিত্তিতে কৃষিভিত্তিক শিল্পও গড়ে তোলা যায়। এতে করে দেশ স্বনির্ভর হবে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে ‘কানেক্টিভিটি’ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যটিতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাড়ছে। তবে চাহিদার কথা বিবেচনা করে বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে ত্রিপুরায়। সংশ্লিষ্টরা একে বাংলাদেশের জন্য এক আশীর্বাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ত্রিপুরার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগরতলা থেকে কলকাতার দূরত্ব ১,৭০০ কিলোমিটার৷ কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রামের দূরত্ব মাত্র ১৪০ কিলোমিটার৷ স্থল কাস্টমস স্টেশনের মধ্য দিয়ে ঐ দুটি শহর থেকে ত্রিপুরায় মালপত্র আনা অনেক সুবিধাজনক তো বটেই, লাভজনকও৷ এই ভৌগলিক নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে পরিবহণ খরচ কমিয়ে লাভজনক ব্যবসা করা সম্ভব বলে জানান রাজ্যের ব্যবসায়ীরা।

সূত্র জানিয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা বাণিজ্য ভারতের অনুকূলে হলেও ত্রিপুরা-বাংলাদেশের বাণিজ্যের ছবিটা ঠিক তার বিপরীত৷ আখাউড়া স্থলবন্দর সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ১৯৯২৮৯ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর বিপরীতে ২শ’১৪ কোটি ৮৮ লাখ ৬ হাজার ৬৬১ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।

২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ২১১৫১৭মেট্রিক টন পণ্য রফতানি হয়েছে ভারতে। এর বিপরীতে ২শ’৭১ কোটি ৬০ লাখ ৯৪ হাজার ৯৫৫ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ২০৯৯৬২ মেট্রিক টন পণ্য রফতানি হয়েছে ভারতে। এর বিপরীতে ৩শ’৩১ কোটি ৭৬ লাখ ১৫ হাজার ৫৬৯ টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।

জানা গেছে, ত্রিপুরায় বাংলাদেশের মাছ, সিমেন্ট, পাথর, প্রাণের পণ্য, সয়াবিন ও পামওয়েল তেল, হ্যান্ড পাম্প, গৃহস্থালি সামগ্রী খুব চাহিদা রয়েছে।

আগরতলা পচম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ-এর সভাপতি এমএল দেবনাথ বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে আগরতলায়। আমরা বাংদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে থাকি। তবে রপ্তানি খুবই কম। বাংলাদেশে উচ্চ শুল্ক করের কারণে আমরা রপ্তানি করতে পারছি না। শুল্ক কর সমন্বয় করা হলে আমাদের রপ্তানি কিছুটা বাড়বে। ফলে আমাদের উভয় দেশের বাণিজ্যও বাড়বে। সে দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

আখাউড়া স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সদস্য ব্যবসায়ী মো. ফারুক মিয়া বলেন, ত্রিপুরায় গার্মেন্ট পণ্যের ব্যাপক চাহিদা আছে। কিন্তু এজুডাই ল্যাব না থাকায় গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করতে পারছি না। এ বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে বার বার আবেদন করেছি। কিন্তু সে বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নেই।এটি করলে পারলে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আসবে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, সেভেন সিস্টার্স আমাদের জন্য একটা ভালো মার্কেট হতে পারে। সিমেন্টসহ কিছু আইটেম সেখানে যাচ্ছে। গ্লাসও পাঠাই আমরা। দেশের রপ্তানি বাড়াতে এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সেভেন সিস্টারে রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ নজর রয়েছে সরকারের। সবচেয়ে বন্ধুপ্রতীম রাজ্য ত্রিপুরায় প্রতি আরও বেশি নজর রয়েছে আমাদের। এক্ষেত্রে যে ধরণের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা রয়েছে তা দূর করা হবে।
আগরতলায় নিযুক্ত বাংলাদেশের সহকারি হাই কমিশনার কিরিটি চাকমা বলেন, ত্রিপুরায় সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কাজ করা হচ্ছে। আর বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সব ধরণের সহায়তায় প্রস্তুত হাই কমিশন।

ত্রিপুরা বিধান সভার প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ এবং প্রাক্তন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী পবিত্র কর বলেন, ১৯৯৪ সাল থেকে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য শুরু হয়। এরপর থেকে প্রতিনিয়ত বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, ত্রিপুরায় বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য আসে। বাংলাদেশি পণ্যের মান ভালো। এ ছাড়া ভারতের অন্য রাজ্য থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা কিছুটা ভালো হওয়ায় এ বাজার তৈরি হয়েছে। আমরা আশা করছি ত্রিপুরার বাজার ধরে রাখতে বাংলাদেশি পণ্যের মান আরও ভালো হবে। ইতিমধ্যে আমাদের পরিকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও উন্নতি করতে হবে। ভারত-বাংলাদেশের সঙ্গে বিশাল ফারাক রয়েছে বাণিজ্যে। কিন্তু ত্রিপুরায় সঙ্গে ঠিক উল্টো সম্পর্ক। এখানে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এখানে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নতি করতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের আগরতলামুখী হওয়া উচিৎ।

আগরতলার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, বাংলাদেশের সিমেন্ট, পাটজাত ও প্লাসটিক পণ্য, কোমল পানীয়, ঢেউটিন, চিটাগুড়, মাছ, শুটকির চাহিদা রয়েছে বেশি। জানা গেছে, নব্বই-এর দিকে ইলিশ রপ্তানি হতো ত্রিপুরায়। এরপর অন্যান্য মাছেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে সেখানে। পাহাড়বেষ্টিত ত্রিপুরায় নদী-নালা-খাল-বিল কম হওয়ায় মাছের যোগান কম। ত্রিপরার অধিকাংশই মানুষ বাঙালি। বাকি জনগোষ্ঠী আদিবাসী। আর সারাবিশ্বে বাঙালির পরিচয় তো ‘মাছে ভাতে বাঙালি।’ এজন্য বাংলাদেশি মাছের চাহিদা রয়েছে ত্রিপুরায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় রয়েছে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির নানা সুযোগ। আর ত্রিপরায় রয়েছে পর্যটন সুবিধা। তাই আগরতলা অনেকটা বাংলাদেশমুখী। আর এসব কারণে দুই দেশের সরকার রাজধানী ঢাকা থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর হয়ে সরাসরি আগরতলা পর্যন্ত চালু করেছে বাস সার্ভিস।

ত্রিপুরার আমদানিকারক এবং বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ত্রিপুরা রাজ্যে একচেটিয়া বাজার ধরে রেখেছে বাংলাদেশের সিমেন্ট, প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী, নানা জাতের মাছ ও তৈরি পোশাক। এ ছাড়া প্রতিদিনই বাংলাদেশ থেকে আসছে ভাঙা পাথর, পিভিসি পাইপ, প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয়, ধাতব, কাঠ, শুকনা মাছ, সিনথেটিক নিটেড ফ্যাব্রিকস, সিরামিক টাইলস, অ্যালুমিনিয়াম, ব্যাটারি, ইট ভাঙার মেশিন, তাঁতের শাড়ি, মেলামাইন সামগ্রীসহ নানা পণ্য।

ইন্দো-বাংলা সেতুবন্ধনের ত্রিপুরা রাজ্যের সভাপতি এবং ত্রিপুরা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইন্টারপ্রিনিউরস এর সভাপতি সুব্রত রঞ্জন রায় বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে ত্রিপুরায়। এছাড়া ত্রিপুরায় বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রাণ ত্রিপুরায় কারখানা স্থাপনের আগে যে ধরণের পণ্য সরবরাহ করত। এখন তারচেয়ে অনেক বেশি পণ্য সরবরাহ করে থাকে।

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes
Scroll Up
error: Content is protected !!