Home » শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য » মাওলানা আব্দুল আউয়াল এক ইতিহাস
মাওলানা আব্দুল আউয়াল এক ইতিহাস

মাওলানা আব্দুল আউয়াল এক ইতিহাস

ইঞ্জি. হা. মাও. মাহবুবুর রহমান
১৯৪১ সালে গাজীপুর জেলার, কাপাসিয়ার, সনমানিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ গাঁও গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৪১ সালে জম্ম গ্রহন করেন আর মৃত্যু বরন করেন ১২ মে, ২০১৯। আব্দুল আউয়াল-এর পিতা- মৃত: হাজী শাহজালাল ছিলেন একজন ক্বারি। মাতা-মৃত: মমতাজ। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান।

তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় স্থানীয় মসজিদভিত্তিক মক্তবের মাধ্যমে। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শুরু হয় দক্ষিণ গাঁও কুড়ের পাড় হেলাল উদ্দিন সরকার হাফেযিয়া মাদরাসা থেকে। তারপর তিনি চলে যান হরিনারায়নপুর ফাযিল মাদরাসা (মনোহরদী উপজেলা) সেখান থেকে দাখিল, আলিম পাশ করেন। তারপর চলে যান শ্রীপুর বাগনাহাটী কামিল মাদরাসা, সেখানে ফাজিল পাশ করেন পরে সরকারি মাদ্রাসা-ই আলিয়া, ঢাকা থেকে কামিল পাশ করেন।

তিনি অসংখ্য খ্যতিমান আলেমদের কাছ থেকে ইলমে দ্বীন অর্জন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ওস্তাদরা হলেন:-
• মুফতি আমিমুল ইহসান (প্রিন্সিপাল, সরকারি মাদ্রাসা-ই আলিয়া, ঢাকা)
• মাওলানা আব্দুল হাই
• মাওলানা আব্দুল হক
• মাওলানা ওসমান গনী
• মাওলানা চানপুরী
• মুহাদ্দিস ছদরুদ্দিন
• মাওলানা রওশন আলী আরো অনেক শায়েখ (আল্লাহ সবাইকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন,আমীন)।

তিনি অসংখ্য আলেমের ওস্তাদ, তার উল্লেখযোগ্য ছাত্ররা হলেন:-
• মাওলানা ঈমান আলী (প্রিন্সিপাল, বেগুন হাটি ফাজিল মাদরাসা)
• মাওলানা মোসলেহ উদ্দিন (সহঃ অধ্যাপক, হাতিরদিয়া ডিগ্রি কলেজ)
• মাওলানা নাসির উদ্দিন (সুপার, দক্ষিণ গাও কালিয়াব দাখিল মাদরাসা)
• মাওলানা মুতালিব হোসেন বরকতি (ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল, হরিনারায়নপুর ফাজিল মাদরাসা)
• মাওলানা মুফাজ্জল হোসেন,( ভাইস প্রিন্সিপাল, বেগুন হাঁটি আলিম মাদরাসা)
• মাওলানা আজহারুল হক,(শিক্ষক, দক্ষিণ গাও কালিয়াব দাখিল মাদরাসা)
• মাওলানা হেলাল,(সাবেক শিক্ষক, দক্ষিণ গাও কালিয়াব দাখিল মাদরাসা)
• কারী আহসান উল্লাহ,(শিক্ষক, দক্ষিণ গাও কালিয়াব দাখিল মাদরাসা)
এছাড়া আরো অনেক প্রিয় ছাত্র (সবার নাম উল্লেখ করতে না পারাতে দুঃখ প্রকাশ করছি) (আল্লাহ তুমি সকলকে কবুল কর, আমীন)।

ছাত্র জীবন থেকে তাঁর ছিল কুরআন ও হাদিসের প্রতি প্রবল আগ্রহ। বিশেষ করে কুরানের তাফসীর শাস্ত্রের প্রতি ছিল প্রচণ্ড ঝোঁক। ছোটকালে আমি দেখেছি আমাদের বাড়িতে অনেক তাফসির গ্রন্থ, যেমন:- তাফসিরে বায়জাবি, তাফসিরে কুরতুবি, তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে মারেফুল কুরআন ইত্যাদি ছিল। (সে জন্যে তিনি আমাকে ফাযিল পাস করার পর প্রথমে তাফসিরে কামিল করার জন্য বলছিলেন পরে হাদিসে করার জন্য। আল্লাহর রহমতে আমি সরকারি মাদ্রাসা-ই আলিয়া, ঢাকা থেকে তাফসিরে কামিল করেছি। আলহামদুলিল্লাহ)
হাদিস শাস্ত্রের প্রতি ও তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। বিশেষ করে সিয়াহ সিত্তাহ হাদিস গ্রন্থ গুলো আমাদের বাড়িতে আমি ছোটকাল থেকেই দেখে আসছি এবং সবসময় এগুলোর চর্চা অব্যাহত ছিল।

তিনি ছাত্র অবস্তাতেই বিভিন্ন জায়গায় কুরআনের তাফসির করতেন। এলাকায় বিভিন্ন মসজিদে কুরআনের প্রকৃত ব্যাখ্যা/মর্ম মানুষের মাঝে তুলে ধরতেন।

কর্ম জীবন :
তিনি ধলেশ্বরী সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। তারপর তিনি হরিনারায়নপুর ফাযিল মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন, এছাড়া টংগী হায়দারাবাদ ফাযিল মাদরাসায় আরবি প্রভাষক, দক্ষিণ গাঁও কালিয়াব দাখিল মাদরাসা ১৯৭৬ এর প্রতিষ্ঠাতা সুপার, দক্ষিণ গাঁও বালিকা দাখিল মাদরাসা ১৯৮৫ এর প্রতিষ্ঠাতা সুপার, চালা সালামিয়া দাখিল মাদরাসার সহ- সুপার (ভারপ্রাপ্ত সুপার), সেকান্দরদী হাইস্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন।

সফল সংগঠক :
তিনি একজন সফল সংগঠক ছিলেন, তিনি প্রতিষ্ঠা করেন :-
• দক্ষিণ গাঁও কালিয়াব দাখিল মাদরাসা (প্রতিষ্ঠাতা সুপার/প্রধান শিক্ষক)
• দক্ষিণ গাঁও বালিকা দাখিল মাদরাসা (প্রতিষ্ঠাতা সুপার/প্রধান শিক্ষক)
• তিনি কাপাসিয়া উপজেলা সহ অন্যান্য উপজেলায় অসংখ্য মসজিদের ভিত্তি স্তাপন করেন। এ সকল প্রত্যেকটি কাজের পিছনে ছিল যার কথা না বললে অন্যায় হবে সে আমাদের আম্মা, যার উত্সাহ, অনূপেরণা, কষ্ট, সর্বোচ্চ ত্যাগ (কারণ বলে রাখি আমাদের পরিবার ছিল অর্থকষ্টে ভরা)

ঈদগাহের ইমাম :
তিনি ১৯৬৩ সাল থেকে দক্ষিণ গাঁও (কুড়ের পাড়) বর্তমানে (সনমানিয়া ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ) ছাত্র অবস্থাতেই ইমাম হিসাবে নিযুক্ত হন। আমূত্যু তিনি এই খেদমত করে গেছেন। প্রায় ৫৬ বছর (১৯৬৩-২০১৮) তিনি এ দায়িত্তে ছিলেন ( আল্লাহ তুমি তাঁর এ খেদমতকে কবুল কর, আমিন।)

খতিবী দায়িত্ব :
তিনি অনেক মসজিদে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন যেমন :-
• দক্ষিণ গাঁও হাজী বাড়ি জামে মসজিদ
• দক্ষিণ গাঁও বেপারি পাড়া জামে মসজিদ
• আড়াল ভুইয়া বাড়ি জামে মসজিদ
• গাজীপুর ভাওয়াল মির্জাপুর জামে মসজিদ
• আড়াল উত্তর পাড়া জামে মসজিদ (আমৃত্যু)

পারিবারিক জীবন :
তিনি চরসনমানিয়া মাওলানা লোকমান হাকিম মোল্লা সাহেবের এক মাত্র কন্যা হামিদা বেগম এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর সহধর্মনী ১৯৭২ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় গাজীপুর জেলায় ১ম হন। তিনি ছিলেন আল্লাহর এক নেক বান্দী (আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদাওস দান করুন, আমিন)।

উনারা রেখে যান ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে :-
১। মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ (এম, এ)- বাংলাদেশ নৌবাহিনী (পেটি- অফিসার) কর্মরত।
২। ফাতেমা (ট্রিপল এম,এ) সিনিয়র আরবি প্রভাষক, শেখের গাঁও জে ইউ ফাজিল মাদরাসা
৩। মাওলানা মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ জালালী (ট্রিপল এম, এ) প্রধান মুহাদ্দিস, দেওয়ানগঞ্জ কামিল স্নাতকোত্তর মাদরাসা। চেয়ারম্যান –কুরআন সুন্নাহ অ্যাকাডেমি ঢাকা।
৪। রোকেয়া সুলতানা (ডাবল এম, এ) সিনিয়র টিচার (ইসলাম শিক্ষা) শহিদ লে: আনোয়ার গার্লস কলেজ, ঢাকা।
৫। ইঞ্জিনিয়ার হাফেজ মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার- মাইক্রো সিস্টেম বিডি লিঃ, প্রভাষক (আইসিটি) আনন্দপুর ডিগ্রী কলেজ, কুমিল্লা,পরিচালক–কুরআন সুন্নাহ অ্যাকাডেমি ঢাকা।
৬। মাহমুদ হাসান -বাংলাদেশ নৌবাহিনী (পেটি-অফিসার) কর্মরত।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ও ছিল তাঁর অংশগ্রহণ:-
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি টঙ্গীতে হায়দারাবাদ ফাজিল মাদ্রাসায় (প্রভাষক-আরবি) চাকরি করতেন। সেখানে তিনি মুক্তি বাহিনীর সাথে যুদ্ধে অংশ নেন এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে বন্দী ও হন, তাকে বের করে নিয়ে আসেন তত্কালীন হায়দারাবাদ ফাজিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল।

মক্কা-মদিনা যিয়ারত :
তিনি মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে ৪ বার সৌদিতে যান। (১৯৯৪,২০০৮.২০১৪,২০১৯) ২ বার বড় হজ্জ করেন। ওমরা হজ্জ করেন অসংখ্য (২০ বা তার বেশী) বার। (আল্লাহ তুমি কবুল কর, আমিন।)
মক্কা (ক্বাবা শরিফ) ও মদিনার (মসজিদে নববী) প্রতি তাঁর ছিল তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি সব সময় মুনাজাতে এই দোআ করতেন “হে আল্লাহ আমাদেরকে মক্কা মুয়াজ্জামা ও মদিনা মুনাওরা বার বার যাওয়ার তৌফিক দান কর” আল্লাহ তাঁর দুয়া কবুল করেছেন।

শেষের জীবন :
শেষ জীবন তিনি বাড়িতে অবস্থান করেন। আড়াল উত্তর পাড়া জামে মসজিদে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এ সময় প্রতিষ্ঠা করেন (১) সনমানিয়া হাজী কল্যাণ সমিতি (কাপাসিয়া) উপদেষ্টা (আল্লাহ এই প্রতিষ্ঠান কে কবুল কর, আমিন)। যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আমৃত্যু ছিলেন।
(২) কুরআন সুন্নাহ অ্যাকাডেমি ঢাকা। প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে আব্বা আমাকে অনেক উত্সাহ, প্রেরণা ও পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান উপদেষ্টা (আল্লাহ এই প্রতিষ্ঠানকে কবুল কর, আমিন)।
(৩) নিজ বাড়ীতে একটি হেফজ খানা ও মাদরাসা করার পরিকল্পনা করে গেছেন (যা অসমাপ্ত) (আল্লাহ এই প্রতিষ্ঠান কে কবুল কর, আমিন)।

আব্বা আমাকে অনেক উপদেশ দিয়ে গেছেন –যেমন:-
• তাহাজ্জদ সালাত পড়া
• কুরআন তিলাওয়াত করা
• সুদ-ঘুষ, অন্নায়-অবিচার থেকে বিরত থাকা
• অল্পতে তুষ্ট থাকা ইত্যাদি

পরিশেষে :
এই বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন কাপাসিয়া তথা গাজীপুরে ইসলামী শিক্ষার অগ্রদূত, শত শত আলেমের উস্তাদ, শিক্ষানুরাগী, নারী শিক্ষার প্রথিকৃত, ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আল্লাহর সৈনিক, সমাজ সেবক সর্বোপরি পিতাকে হারানো এক অপূরণীয় ক্ষতি। আল্লাহ তোমার কাছে দাবি জানাচ্ছি তাঁর অসমাপ্ত কাজ গুলো আমাদের দ্বারা বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান কর, আমিন।

ছেলে-মেয়ে দের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা :
* মাওলানা আব্দুল আউয়াল মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট/ ফাউন্ডেশন তৈরি করা।
আল্লাহ উনাকে ও উনার সহধর্মনী কে জান্নাতুল ফেরদাউস-এর সর্বোচ্চ মাকাম দান কর আমিন, সুম্মা আমিন।
(কোন তথ্যগত ভুল ত্রু টি সংশোধনযোগ্য)
লেখক : মাওলানা আব্দুল আউয়াল ৩য় ছেলে।

লাইক ও শেয়ার করুন:
BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes
Scroll Up
Social media & sharing icons powered by UltimatelySocial
error: Content is protected !!