Home » জাতীয় » প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন অপরাজনীতি রুখে দিন: মানবিক ছাত্রসমাজ গড়তে সাহায্য করুন -বি. চৌধুরীর
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন অপরাজনীতি রুখে দিন: মানবিক ছাত্রসমাজ গড়তে সাহায্য করুন -বি. চৌধুরীর

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন অপরাজনীতি রুখে দিন: মানবিক ছাত্রসমাজ গড়তে সাহায্য করুন -বি. চৌধুরীর

বি. চৌধুরীর বিশেষ নিবন্ধ 

আবরার হত্যার মাধ্যমে বুয়েটে যা ঘটেছিল এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা মর্মান্তিক এবং কলংকিত অধ্যায়। বাংলাদেশের সর্বত্র শুধু এটা নিয়ে নিন্দা হয়নি, দেশের বাইরেও এটা নিন্দিত হয়েছে। নিন্দা হয়েছে প্রতিবেশি দেশের ফেসবুকে, হয়েছে জার্মানিতে, যুক্তরাজ্য, আমেরিকা এমনকি জাতিসংঘেও। শুধু এইটুকুতে এর গুরুত্ব আমাদের বোঝা উচিত এবং সরকার সেটা বুঝেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সে ভাবেই এটা বিবেচনাও করেছেন। এজন্য সরকারকে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সর্বপ্রথম অভিনন্দন জানাই।

এই প্রচণ্ড ঘৃণা, এই দুর্নিবার দুঃখ এবং বেদনার মধ্যে যে আশার আলো ফুটে উঠেছে সেটুকু যেন ভবিষ্যতে আরো আলোময় হয়ে ক্রমান্বয়ে একটি বিপর্যস্ত ছাত্র সমাজকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারে: এটাই আমাদের আজকের দিনের প্রার্থনা। তারপরও বলতে হয়, এই সমস্যার গভীরে আমাদের যেতেই হবে, সমস্যার ক্লাইমেক্স অবশ্যই আবরার হত্যার মতো একটি নিষ্ঠুর ঘটনা, এতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু এই সমস্যা যে আমাদের দেশে কমবেশি ছিল এটা মানতেই হবে। অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় যাদের দেশের ভবিষ্যৎ বলি, সেখানে অনেক ছাত্রের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ এবং হত্যা অনুষ্ঠান আমরা আগেও বারবার দেখেছি, বহুদিন ধরে এটা দেখছি।

সেজন্য সমস্যার গভীরে না গিয়ে আমরা এর চট করে সমাধান করতে পারব না। সামগ্রিক বা “হলিস্টিক এপ্রোচ” দরকার। সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান আমাদের খুঁজে পেতেই হবে। সমস্যার গভীরে যেতে হলে আমাদের দায়িত্ব সবার। যে কোনো মূল্যে সুন্দর একটি ছাত্র সমাজ গড়ে তুলতেই হবে। ছাত্ররাই হলো আমাদের ভবিষ্যৎ। সেই জন্য যারাই এরমধ্যে অবদান রাখতে পারবে তাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য আজকে নতুন করে আমাদের ভাবতে হবে।

ছাত্রদের মধ্যে প্রীতি ও সম্প্রীতি কেনো হারিয়ে যাবে? শুধু রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে এবং অন্য কোনো সামাজিক কারণে অথবা ছাত্রদের মধ্যে পারস্পরিক কাছাকাছি আসার যে রীতি ছিল সেই রীতির অবক্ষয় হয়ে গেছে বলে। ‘ঘৃণা নয়, শ্রদ্ধা’ এটাই কিন্তু মূলনীতি হতে হবে। ঘৃণা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না। ঘৃণা দিয়ে মানুষকে কনভিন্স করা যায় না। মতপার্থক্য থাকলে ঘৃণা দিয়ে সেই মতপার্থক্য দূর করা যাবে না। শ্রদ্ধা থাকতেই হবে, ভালোবাসা থাকতেই হবে। যুক্তি থাকতে হবে। আমাদের ছাত্রদের বুঝতে হবে, ছাত্ররা পরস্পর অনেক দূরে সরে যাচ্ছে, একজন আরেকজনের কাছ থেকে।

তাদের অনেক কাছাকাছি আনতে হবে। শুধুমাত্র বই বগলে করে ক্লাসে গেলেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না, এটা বোঝার শেষ সময় আজকে। শিক্ষা মানে শুধু পাশ করা নয়। মানুষ হতে হবে। আমরা দেখেছি, আমাদের ছেলেরা বেশ কিছুদিন আগেও শিক্ষাঙ্গনে স্পোর্টস এবং সাংস্কৃতিক উৎসব পালন করতো। খেলাধুলার প্রতিযোগিতার মধ্যে ছাত্ররা তাদের প্রতিযোগী মনোভাব বাড়াতো। বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করার জন্য সেটা ছিল একটা মস্ত বড় সুযোগ। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকে তেমন সব অনুষ্ঠান দেখা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলে বার্ষিক খেলাধুলা আজকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

নোট বই মুখস্থ করা এবং কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্যে মা-বাবা বাচ্চাদের সারাক্ষণ লেখাপড়ার মধ্যে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। শরীর চর্চা নেই, খেলাধুলা নেই। সুতরাং একদিকে যেমন তারা শুধুমাত্র বই মুখস্থমুখি হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য এবং প্রতিযোগিতার মনোভাব ধীরে ধীরে কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছে।

একইভাবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনও ছিল ছাত্রদের চরিত্র গঠনের একটি বড় উপাদান। নাটক হতো স্কুলে-কলেজে সব জায়গায়, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা হতো, গান হতো, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হতো, সেগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এ সব কর্মকান্ডে মন যেমন বিকশিত হয়, সুন্দর মনের সৃষ্টি হয়, তেমনি বন্ধুত্ব এবং একে অন্যের কাছাকাছি হওয়ার মস্ত বড়ো সুযোগ সৃষ্টি হয়।

প্রশ্ন হল: ১. এই সুযোগগুলো হারিয়ে গেল কেনো? এসব নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এই দায়িত্ব একদিকে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর, তেমনি নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের তথা সরকারের।

২.উপাচার্য, অধ্যক্ষ, শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন এদের অনেক দায়িত্ব রয়ে গেছে। অতীতে যেমন শিক্ষকদের এবং ছাত্রদের মধ্যে গভীর যোগাযোগ ছিল। শিক্ষকরা যেমন শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন ছাত্রদের কাছে তেমনি ছাত্ররাও শিক্ষকের কাছে স্নেহের পাত্র ছিল। আজকে অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতভেদের কারণে অনেক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এই জন্য শিক্ষক, অধ্যক্ষ, উপাচার্য ও প্রশাসনের যারা আছেন তাদের অনেক বেশি দায়িত্ববান হতে হবে। শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে রাজনীতি করার সুযোগ এবং প্রবণতা নিয়েও রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে।

আপনি যদি বিদেশে যান সেখানে দেখবেন শিক্ষক এবং ছাত্রদের মধ্যে কি নিবিড় সম্পর্ক। ছাত্রদের সমস্যা হলে শিক্ষকের কাছে যায়, হয়তো প্রশাসকদের কাছেও যায়। সেই ক্ষেত্রে ছাত্র এবং শিক্ষকদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা করা যায়। আজকে ছাত্রদের সাথে শিক্ষকদের সেই সম্পর্ক আছে কি-না, তা তারাই বিবেচনা করুক। নিশ্চয়ই অনেক শিক্ষক আছেন তাঁরা ছাত্রদের কাছে অনেক শ্রদ্ধার পাত্র এবং শিক্ষকরা যে সিদ্ধান্ত দেন সে সিদ্ধান্ত ছাত্ররা মাথা পেতে নেয়। কাজেই শিক্ষকদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। প্রশাসনকেও এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। চিন্তা করতে হবে আমরা যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছি কি না।

৩. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টিভি ও সংবাদপত্র এবং স্মার্ট্ ফোনে আজকে প্রতিটি ছাত্র আনুমানিক ১ থেকে দেড় ঘন্টা সময় ব্যয় করেই থাকে। এটা ভালো কি-না মন্দ, তা নিয়ে আমি আজকে আলোচনা করবো না। কিন্তু এটা যে একটি বাস্তবতাও তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে এবং এই বাস্তবতার সুযোগ নিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিভাবে আমরা বন্ধুত্বের প্রসার ঘটাতে পারি, হিংসার প্রসার নয় সে ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে হবে। ঘৃণা নয়, অশ্রদ্ধা নয় এ সব বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোর একটা দায়িত্ব রয়েছে। টেলিভিশনের দায়িত্ব আছে, সাংবাদিকদের দায়িত্ব আছে। আজকে আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে টেলিভিশনে যেসব রোমহর্ষক হত্যার ঘটনা, নাটক ইত্যাদি দেখানো হয় তা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। শুধু বিদেশিদের দোষ দিলে চলবে না। আমাদের নাটকগুলো, আমাদের সিনেমাগুলো কি পরিমাণ রোমহর্ষক হত্যাকান্ড, ধর্ষণ্ দেখাচ্ছে সেগুলো আমাদের আমলে আনতে হবে।

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes
Scroll Up
error: Content is protected !!